ভারতীয় সিনেমার জগতে একজন অত্যন্ত সম্মানিত নাম অপর্ণা সেন। তিনি শুধু একজন দক্ষ অভিনেত্রীই নন, বরং একজন সংবেদনশীল চলচ্চিত্র পরিচালক এবং সমাজের নানা জটিল বিষয় নিয়ে খোলামেলা মত প্রকাশকারী একজন চিন্তাশীল মানুষ হিসেবেও পরিচিত। ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, বিবাহ বা বিচ্ছেদ, এই সব বিষয় নিয়ে তিনি বরাবরই স্পষ্ট ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, যা অনেক সময়ই সমাজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
বিবাহ ও সম্পর্ক নিয়ে তাঁর মতামতও বরাবরই আলাদা। অপর্ণা সেন মনে করেন, একটি সম্পর্ক যদি প্রাণহীন হয়ে পড়ে বা সেখানে যদি ভালোবাসা, সম্মান ও বোঝাপড়া না থাকে, তাহলে সেই সম্পর্ককে শুধু সামাজিক বাধ্যবাধকতার জন্য টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনও অর্থ নেই। তাঁর মতে, একটি “মৃত সম্পর্ক” ধরে রাখার চেয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা অনেক বেশি সম্মানের। তিনি আরও বলেন, কোনও বিয়ে হঠাৎ করে ভেঙে যায় না, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, না-বলা কষ্ট এবং মানসিক দূরত্বের ফলেই বিচ্ছেদ ঘটে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অপর্ণা সেন বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে আরও গভীর এবং বিতর্কিত মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিয়ে আসলে মানুষের তৈরি একটি সামাজিক ব্যবস্থা, এবং এটি মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাহিদা থেকেই তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, প্রাচীনকালে পুরুষরা তাদের সম্পত্তি ও বংশপরম্পরা বজায় রাখার জন্যই এই প্রথার সূচনা করেছিল, যাতে তাদের সম্পত্তি তাদের নিজের সন্তানদের হাতেই থাকে এবং অন্য কারও কাছে না যায়।
এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, যখন মানুষ শিকার করা থেকে চাষাবাদে আসে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে, তখন থেকেই সম্পত্তির ধারণা তৈরি হয়। আর সেই সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে নিজের সন্তানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই বিয়ের নিয়ম চালু হয়। সেই কারণেই তখন স্ত্রীদের উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হতো সহবাস নিয়ে, যাতে সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে কোনও সন্দেহ না থাকে, কারণ সেই সময়ে তো ডিএনএ পরীক্ষার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না।
অপর্ণা সেনের এই মন্তব্য স্পষ্টভাবে দেখায়, তিনি সমাজের প্রচলিত ধারণাগুলিকে নতুনভাবে ভাবতে শেখান। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যেমন বিবাহ প্রথা তৈরি করেছে, তেমনই বর্তমান সময়ে সেই মানুষই বিবাহ বিচ্ছেদকেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শিখছে। তাঁর এই খোলামেলা ও যুক্তিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেকের কাছে সাহসী মনে হলেও, সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে বোঝার জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন অনেকে।






