প্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অকালমৃত্যুর পর কেটে গিয়েছে প্রায় এক মাস। তবুও শোক, প্রশ্ন আর না-পাওয়ার যন্ত্রণা আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁর পরিবারকে। অভিনেতার মৃত্যু ঘিরে এখনও একাধিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি বলেই দাবি পরিবারের। এবার সেই নিয়েই মুখ খুললেন রাহুলের মা শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়। এক আবেগঘন সাক্ষাৎকারে ছেলের মৃত্যু নিয়ে ক্ষোভ, হতাশা এবং ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরলেন তিনি। সবচেয়ে বেশি যেটা তাঁকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে, তা হল, একদিন রাহুলের ছেলে সহজ যেন জানতে পারে, “তার বাবা কেন মারা গেল।”
সাক্ষাৎকারের শুরু থেকেই ভেঙে পড়তে দেখা যায় শ্যামলী দেবীকে। তিনি বলেন, “আমি চাই না কারও সন্তান এভাবে চলে যাক, কারও বাবা চলে যাক। আমার সহজ বড় হয়ে যেন জানতে পারে সত্যিটা কী? কেন এরকম হল?” তাঁর কথায়, আজও পরিবার জানতে পারেনি ঠিক কীভাবে মৃত্যু হল রাহুলের। সেই কারণেই তিনি বারবার সত্যিটা সামনে আনার আবেদন জানিয়েছেন।
রাহুল সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তাঁর তিনি। তিনি বলেন, “ও শুধু অভিনেতা ছিল না, খুব ভালো মানুষ ছিল। সবাইকে সম্মান করত, ভালোবাসত। যে জল দিত তাকেও সম্মান করত। বাড়ির মাসি মুড়ি খেয়ে শুয়ে পড়লে বলত, ‘মাসি, ঘুগনি দিয়ে খাও, তাহলে পেট ভরবে।’ এত ছোট ছোট বিষয়ও ওর নজরে থাকত।” ছেলের মানবিক দিক তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “স্নেহ তো করতামই, কিন্তু ওর বোধবুদ্ধিকে আমি সম্মানও করতাম।”
রাহুলের মৃত্যু যে এখনও তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য, তা বারবার উঠে এসেছে তাঁর কথায়। শ্যামলী দেবীর আক্ষেপ, “এত সহজে একটা মানুষ হারিয়ে গেল? এত লোক, এত বড় ইউনিট, এত কাজের মধ্যে থেকে একটা তরতাজা ছেলে চলে গেল, আর আমরা এখনও জানলাম না কী হল?” তিনি আরও বলেন, “আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু জানতে তো চাইব, কোথায় অবহেলা হল? কী এমন হল যে আমার ছেলে আর ফিরল না?”
প্রোডাকশন হাউস বা সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে শ্যামলী দেবী স্পষ্ট বলেন, “না, কেউ আসেনি। আমি কাউকে দেখিনি।” যদিও শিল্পী মহলের বহু মানুষ তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলেও জানান তিনি। তাঁর কথায়, “প্রসেনজিৎ, জিৎ, ঋত্বিক, সৌরভ, ইন্দ্রাশিস, সবাই পাশে থেকেছে। আর্টিস্ট ফোরামও অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো আমার সন্তানকে ফিরে পেলাম না।”
সাক্ষাৎকারে উঠে আসে রাহুলের সংগ্রামের কথাও। শ্যামলী দেবী বলেন, “অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে এসেছে ও। অনেক কিছু পাওয়ার ছিল, সব পায়নি। কিন্তু কোনওদিন কাজকে ফাঁকি দেয়নি।” অভিনয়, লেখা, পডকাস্ট সব ক্ষেত্রেই রাহুলের ভালোবাসা ছিল নিখাদ, এমনটাই দাবি তাঁর মায়ের।
সবচেয়ে বেশি যেটা তাঁকে কষ্ট দেয়, তা হল ছেলের শেষ মুহূর্তের স্মৃতি। তিনি জানান, শুটিংয়ে যাওয়ার আগে রাহুল তাঁকে বলেছিল, “আমি কিন্তু শুটিং থেকে বেরিয়ে সোজা ঘুরতে যাব।” সেই মানুষটাই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিথর দেহ হয়ে ফিরবে, তা ভাবতেই পারেননি তিনি। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “এক লহমায় আমার জীবনটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল।”
রাহুলের মৃত্যুর খবর কীভাবে পান, সেটাও জানান তিনি। চারদিক থেকে ফোন আসতে শুরু করে। কেউ তাঁকে বাড়ির সামনে যেতে বলেন, কেউ আবার “চরম ঘটনা” ঘটেছে বলে জানান। এরপরই আশঙ্কা সত্যি হয়। সেই দিনটাকে আজও “কালো দিন” বলেই মনে করেন তিনি। তবে শুধু নিজের ছেলের জন্য নয়, ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন শ্যামলী দেবী। তাঁর কথায়, “আজকাল ছেলেমেয়েরা এটাকে প্রফেশন হিসেবে নিচ্ছে। কিন্তু সেই প্রফেশনের জন্য যেন প্রাণ না যায়। সবাইকে সত্যিটা জানতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কারও সঙ্গে এমন না হয়।”
রাহুলের ছেলে সহজের প্রসঙ্গ উঠতেই আবারও ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, “আমার সন্তান তো আর ফিরবে না। কিন্তু সহজ বড় হয়ে যেন সত্যিটা জানতে পারে। ও যেন জানতে পারে, তার বাবার সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল।” অভিনেতা, লেখক, চিন্তাশীল মানুষ নানা পরিচয়ের বাইরেও রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এক অসম্ভব মানবিক মানুষ, এমনটাই দাবি তাঁর মায়ের। আর সেই মানুষটার অকালমৃত্যুর উত্তর খুঁজতেই আজও লড়ে চলেছে তাঁর পরিবার।






