সুজন নীল মুখার্জি বাংলা থিয়েটার, টেলিভিশন এবং সিনেমার এক পরিচিত মুখ। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের জগতে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। কিন্তু এই পরিচিতির পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, অভাব, ত্যাগ আর অবিরাম লড়াইয়ের গল্প। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের সেই অজানা অধ্যায় খুলে বললেন অভিনেতা। সেখানে উঠে এল মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়ে ওঠার কষ্ট, থিয়েটারের জন্য ব্যক্তিগত জীবনে করা ত্যাগ, আর আজকের টেলিভিশন জগৎ নিয়ে তাঁর স্পষ্ট মতামত।
হাওড়ার শিবপুরে জন্ম সুজন মুখোপাধ্যায়ের। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরেই থিয়েটারের জগতে প্রবেশ। তাঁর বাবা ছিলেন থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু শুধুমাত্র অভিনয় করে সংসার চালানো সম্ভব ছিল না। তাই সরকারি চাকরি করেই সংসারের দায়িত্ব সামলাতে হতো। সেই বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন সুজন। তিনি বলেন, “আমরা একেবারে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে বড় হয়েছি। বাবার থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা ছিল, কিন্তু সংসার বাঁচাতে চাকরি করতেই হতো।” ছোটবেলা থেকেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন শিল্পের পথ শুধু গ্ল্যামারের নয়, এর পেছনে থাকে কঠিন বাস্তব। কলকাতায় আসার পর সরকারি আবাসনে বড় হওয়া, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে জীবনযাপন, সবটাই তাঁর বেড়ে ওঠার অংশ।
আরও পড়ুন: “কৃষ্ণেরও দুই মা ছিলেন…রক্তের সম্পর্কই আসল না, গর্ভজাত সন্তান না হলেও ও-ই আমার সব” ১৩ বছরের ছেলেই বদলে দিয়েছিল জীবন! নিজের সন্তান জন্ম দেওয়ার চেষ্টাও করেননি, তাতে নেই আক্ষেপ! মাতৃদিবসে মনোবীণা ও কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে সুস্নাতকে নিয়ে আবেগঘন, ‘মা’ লাবণী সরকার!
অভিনয়ের পথে তাঁর শুরুটা সহজ ছিল না। ছোটবেলায় পাড়ার নাটক থেকে শুরু, তারপর ধীরে ধীরে বড় মঞ্চে ওঠা। কিন্তু থিয়েটার করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ তখন প্রায় ছিল না বললেই চলে। তিনি স্পষ্ট বলেন, “আগে থিয়েটার থেকে কোনও পয়সা আসত না। থিয়েটার ছিল ভালোবাসার জায়গা, রুজি-রোজগারের জায়গা নয়।” সেই সময় সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন ছিল প্রবল। বহুবার এমন দিন এসেছে, যখন অভিনয়ের স্বপ্ন আর সংসারের বাস্তবতার মধ্যে লড়াই করতে হয়েছে। তবুও হার মানেননি। ১৯৯১ সালে সিনেমায় সুযোগ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে ক্যামেরার সামনে নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করেন। এরপর টেলিভিশনে কাজ, ধারাবাহিকে জনপ্রিয়তা, কিন্তু সেখানেও নিজেকে ধরে রাখার লড়াই ছিল আলাদা।
ব্যক্তিগত জীবনেও কম ঝড় আসেনি। স্ত্রীকে নিবেদিতাকে নিয়ে জীবনের শুরুর দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, একসময় তাঁদের জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। বাড়িতে ফ্রিজ ছিল না, এসি তো দূরের কথা, ছোট্ট একটা টিভি নিয়েই সংসার চলত। এমনকি বাড়িওয়ালার কাছে সম্পর্কের গ্রহণযোগ্যতা পেতেও লড়তে হয়েছে। তাঁর কথায়, সেই সময়টা ছিল সম্পর্ক আর জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এরই মধ্যে ২০২২ সালে মায়ের মৃত্যু তাঁর জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে আসে। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পরের দিনই নাটকের মহড়ায় ফিরতে হয়েছিল তাঁকে। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, “রাতভর শেষকৃত্য সেরে সকালে মহড়ায় ফিরেছিলাম। কারণ দায়িত্ব ছিল, উৎসব ছিল, কাজ থামানো যেত না।” এই ঘটনাই প্রমাণ করে, অভিনয় তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, দায়বদ্ধতা।
আজকের বাংলা টেলিভিশন নিয়েও সরব হয়েছেন সুজন নীল। তাঁর মতে, এখনকার ধারাবাহিকগুলিতে গল্পের বৈচিত্র কমে গেছে। তিনি বলেন, “এখন শুধু মুখ পাল্টাচ্ছে, গল্পের ভিত বদলাচ্ছে না। আগে যে বৈচিত্র ছিল, সেটা হারিয়ে যাচ্ছে।” তবে এত অভিযোগের মধ্যেও তাঁর লড়াই থামেনি। তিনি বারবার কাজ ছেড়েছেন, আবার ফিরেছেন শুধু নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করার জন্য। তাঁর মতে, একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হল শেখার ইচ্ছা। সেই ইচ্ছাকেই পুঁজি করে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত। থিয়েটার, সিনেমা, টেলিভিশন সব জায়গায় নিজের ছাপ রেখে তিনি প্রমাণ করেছেন, সাফল্য রাতারাতি আসে না, তার পিছনে থাকে বছরের পর বছর সংগ্রাম, ত্যাগ আর ধৈর্য।






