প্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু এখনও মেনে নিতে পারছেন না তাঁর পরিবার, বন্ধুবান্ধব কিংবা অনুরাগীরা। বাংলা ইন্ডাস্ট্রির পরিচিত মুখ, অভিনেতা, লেখক এবং ‘সহজ কথা’র পডকাস্টার হিসেবে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন তিনি। আচমকাই তাঁর চলে যাওয়া যেন বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। মৃত্যুর এক মাস পরেও সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি তাঁর মা শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ছেলেকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়তে দেখা যায় তাঁকে। শুধু মৃত্যুর কারণ জানার আর্জিই নয়, সেই কথোপকথনে উঠে এসেছে রাহুলের মানুষ হিসেবে অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কথাও।
সাক্ষাৎকারে শ্যামলী দেবী স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি চান তাঁর নাতি সহজ বড় হয়ে যেন সত্যিটা জানতে পারে। তাঁর কথায়, “আমি চাই সহজ বড় হয়ে জানুক, তার বাবা কেন মারা গেল। এত সহজে একটা মানুষ চলে যেতে পারে না।” তবে এই যন্ত্রণার মাঝেও ছেলেকে নিয়ে গর্ব লুকিয়ে রাখতে পারেননি তিনি। বারবার বলেছেন, রাহুল শুধু জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মানবিক একজন মানুষ। তাঁর ভাষায়, “ভালবাসার আরেক নাম অরুণোদয়। সবাইকে এত ভালোবাসত, এত সম্মান করত, সেটা ভাষায় বোঝানো যাবে না।”
রাহুলের ব্যবহার এবং মানুষের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শ্যামলী দেবী। তিনি জানান, বাড়ির কাজের মানুষ থেকে শুরু করে শুটিং ফ্লোরের প্রত্যেককে সমান সম্মান দিতেন রাহুল। “যে এক গ্লাস জল দিয়েছে, তাকেও ও দাদা বলে ডাকত। সবাইকে এত সম্মান করত যে সবাই ওকে নিজের লোক মনে করত,” বলেই জানিয়েছেন অভিনেতার মা। শুধু তাই নয়, বাড়ির সবার ছোটখাটো বিষয়েও নজর থাকত তাঁর। শ্যামলী দেবী একটি ঘটনার কথা তুলে ধরে বলেন, “বাড়ির মাসি যদি শুধু মুড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ত, ও বলত ‘মাসি, ঘুগনি দিয়ে মুড়ি খাও, তাহলে পেট ভরবে।’ এত ছোট ছোট বিষয় নিয়েও ও ভাবত।”
আরও পড়ুন: “ মানুষের সেবার নাম করে নিজেদের পকেট ভরিয়েছেন! ওদের জন্যই ইন্ডাস্ট্রির অধঃপতন!” নাম না করেই ব্রাত্য বসু, রাজ চক্রবর্তী, সায়নী, সায়ন্তিকাদের ক’টাক্ষ লাবনী সরকারের?
এছাড়াও তিনি বলেন রাহুলের সব চেয়ে বড় গুণ ছিল তাঁর মাটির মানুষ হয়ে থাকা। জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরেও কখনও অহংকার তাঁকে ছুঁতে পারেনি। “এত বড় সেলিব্রিটি হয়েও ও মাটির মানুষের মতোই থেকেছে। ছোট বড় কাউকে আলাদা করে দেখেনি,”, তাঁর দাবি, রাহুলের কাছে সবাই সমান ছিল। অভিনেতা, টেকনিশিয়ান, স্পটবয় কিংবা নতুন শিল্পী প্রত্যেকের সঙ্গে একইরকম আন্তরিক ব্যবহার করতেন তিনি। এমনকি কাজের ক্ষেত্রেও কোনও ফাঁকি পছন্দ করতেন না। রান্না থেকে অভিনয়, লেখা থেকে পডকাস্ট সব কাজই মন দিয়ে করতেন। তাঁর মা বলেন, “যেটা করত, ভালোবেসে করত। কোনও কাজেই ফাঁকি ছিল না।”
রাহুলের শিল্পীসত্তার পাশাপাশি তাঁর মানবিক দিকটাই আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে পরিবারের। শ্যামলী দেবীর কথায়, “ও শুধু অভিনেতা ছিল না, একটা ভালো মনের মানুষ ছিল। সমাজের জন্য ভাবত, নতুন ছেলেমেয়েদের নিয়ে চিন্তা করত।” এখনও ছেলের স্মৃতি আঁকড়েই দিন কাটছে তাঁর। কিন্তু সেই শোকের মাঝেও তিনি চান, মানুষ যেন রাহুলকে শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবেও মনে রাখে। তাঁর কথায়, “সবাই অভিনেতা রাহুলকে চিনত, কিন্তু আমি চাই মানুষ জানুক, ও কতটা ভালো মানুষ ছিল।”






