দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি সরকার। আর তারপর থেকেই যেন একে একে সামনে আসতে শুরু করেছে টলিউডের অন্দরমহলের নানা বিতর্ক, ক্ষোভ ও অভিযোগ। বহু শিল্পী, যারা এতদিন সরাসরি মুখ খুলতে চাননি, তারাও এখন প্রকাশ্যে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করেছেন। সেই তালিকায় এবার নাম জুড়ল জনপ্রিয় অভিনেত্রী লাবনী সরকার এবং তাঁর স্বামী টলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা কৌশিক ব্যানার্জী-র। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাঁরা সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, গত কয়েক বছরে বাংলা বিনোদন জগতে রাজনীতি, পক্ষপাতিত্ব এবং ক্ষমতার দাপট এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে সুস্থ পরিবেশ কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই এক অভিনেত্রীর মন্তব্য ঘিরে ক্ষোভ উগরে দেন লাবনী সরকার। তিনি বলেন, একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর পারিশ্রমিক মোটামুটি কত হতে পারে, সেটা ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেকেই জানেন। সেই হিসেব অনুযায়ী একজন শিল্পী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন, ভালোভাবে সংসার চালাতে পারেন, গাড়ি চড়তে পারেন কিন্তু তারপরেও কীভাবে কয়েক বছরের মধ্যে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি, একাধিক বাগানবাড়ি, অজস্র গয়না ও বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। তাঁর কথায়, “একজন অভিনেতারও তো একটা সীমা আছে। তাহলে এত বিপুল সম্পত্তি কোথা থেকে এল?” এই প্রশ্ন তুলেই তিনি ইঙ্গিত দেন, টলিউডের একটা বড় অংশের সঙ্গে ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
সবচেয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন কৌশিক ব্যানার্জী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যারা এতদিন তৃণমূলের ছত্রছায়ায় থেকে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রভাব বিস্তার করেছেন, তারা যদি আবার নতুন সরকারের মধ্যেও ঢুকে পড়েন, তাহলে টলিউডের পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হবে। মজার ছলে তিনি বলেন, “যারা জামা বদলে নতুন দলে ঢুকবে, তাদের জন্য একটা বড় লাঠি সামনে রাখুন। দয়া করে ঢুকতে দেবেন না। তারা কোনও উপকারে আসবে না, উল্টে আদর্শটাই নষ্ট করবে।” তাঁর দাবি, গত ১৫ বছরে ইন্ডাস্ট্রিতে এমন এক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল যারা নিজেদের ক্ষমতা দেখিয়ে সিনিয়র শিল্পীদেরও অসম্মান করত। অথচ তাদের অভিনয় দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। কৌশিকের কথায়, “চার লাইন সংলাপও গুছিয়ে বলতে পারে না, কিন্তু ক্ষমতার জোরে কাজ পেয়ে গিয়েছে।”
লাবনী সরকারও একই সুরে বলেন, বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে একসময় যে সুস্থ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৃজনশীল পরিবেশ ছিল, সেটা এখন পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। তিনি জানান, আগে স্টুডিও মানেই ছিল আনন্দের জায়গা। ঘন্টার পর ঘন্টা কাজ করেও ক্লান্তি আসত না। কিন্তু এখন শিল্পীদের মধ্যে ভয়, বিভাজন ও রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে শিল্পীদের বিচার করা শুরু হয়েছিল। ফলে যারা নিরপেক্ষ ছিলেন, তারাই সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়েছেন। লাবনীর কথায়, “আমরা যেন নিঃসঙ্গতার সমুদ্রে এক একটা দ্বীপ হয়ে গেছি। কারোর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতেও ভয় হয়।”
সাক্ষাৎকারে কৌশিক ব্যানার্জী আরও দাবি করেন, তাঁকে বহুবার রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র ভিড় টানার জন্য। যদিও তিনি কখনও কোনও রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সমর্থক ছিলেন না বলেই দাবি করেছেন। অভিনেতার কথায়, তাঁকে পারিশ্রমিক দিয়ে রাজনৈতিক র্যালিতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল এবং তিনি সেই পারিশ্রমিক ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমেই পেয়েছেন। তিনি অকপটে বলেন, “আমি ওপেনলি বলছি, আমাকে রেমুনারেশন দেওয়া হয়েছে। অন্যরা হয়তো বলে না, কিন্তু আমি লুকোচ্ছি না।” তবে একইসঙ্গে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন যে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলের সমর্থক হলেই কাজ পাওয়া যায় এই ধারণাকে তিনি পুরোপুরি মানতে রাজি নন। তাঁর মতে, যোগ্যতা থাকলে কাজ মিলবেই, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ ভয়ঙ্করভাবে বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল।
আরও পড়ুনঃ “ফ্রি ভোট ব্যাঙ্কের জন্য ইচ্ছা করে বাংলার সীমান্ত খুলে রাখা হয়েছিল” দাবি বিজেপি সাংসদ তথা অভিনেত্রী হেমা মালিনীর! মোদী-শাহের নেতৃত্বে ‘নিরাপদ বাংলা’র বার্তা দিতেই কি তুললেন অনুপ্রবেশ ও ভোট রাজনীতির প্রসঙ্গ?
এই পুরো সাক্ষাৎকার জুড়ে বারবার উঠে এসেছে একটি কথাই বাংলা বিনোদন জগতকে আবার আগের সুস্থ জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাবি। লাবনী সরকার স্পষ্ট বলেছেন, তাঁরা “টলিউডকে হলিউড” বানাতে চান না, বরং পুরনো সম্মান, নিরাপদ পরিবেশ এবং শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ফিরিয়ে আনতে চান। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের যে অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক চাপে কাজ করতে হচ্ছে, তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁদের বক্তব্য, রাজনীতির অতিরিক্ত হস্তক্ষেপে শিল্পের জায়গা নষ্ট হয়েছে, আর সেই কারণেই আজ টলিউডের ভিত কেঁপে উঠেছে।






