অভিনেতা টোটা রায়চৌধুরীর সম্প্রতি সাক্ষাৎকারে উঠে এল তার জীবনের ব্যক্তিগত শোক, অভিনয়জীবনের সংগ্রাম, বাংলা ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের বাস্তবতা, কাস্টিং নিয়ে বাজারের প্রভাব, রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ, আর অভিনেতা হিসেবে নিজের লড়াইয়ের গল্প। সাম্প্রতিক সময়ে বিনোদন জগতের এক দুঃখজনক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে টোটা স্পষ্ট বলেন, কোনও শিল্পীর চলে যাওয়ার ক্ষত শুধু ইন্ডাস্ট্রির নয়, তাঁর পরিবারের জন্য আজীবনের যন্ত্রণা। সেই আবেগঘন কথার মধ্যেই তিনি খুলে বললেন তাঁর জীবনদর্শন, সময়কে সম্মান করা, শৃঙ্খলাকে আঁকড়ে থাকা, আর নিজের কাজের প্রতি নির্ভেজাল সততা। একই সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের কাস্টিং-রাজনীতি এবং বাজারের প্রভাব নিয়ে তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্য এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে।
অভিনেতা নিজের ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে জানান, মাত্র আট বছর বয়সে তাঁকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যৌথ পরিবারের অত্যন্ত আদরের সন্তান থেকে হঠাৎ এক নিয়ন্ত্রিত জীবনে ঢুকে পড়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না। টোটার কথায়, “প্রথমে অসম্ভব দুঃখ, অসহায়তা আর অভিমান ছিল। কিন্তু মানুষ যে কোনও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, সেটা আমি খুব ছোটবেলাতেই শিখেছি।” তিনি বলেন, তাঁর জীবনের শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, শরীরচর্চা এবং কাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বীজ বপন হয়েছিল সেই বোর্ডিং স্কুলের দিনগুলোতেই। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “ঘড়ি এবং সময় এই দুটো আমার কাছে নন-নেগোশিয়েবল। আমি সময়কে অসম্মান করি না, কারণ সময়ও একদিন আমাকে অসম্মান করবে।”
টোটা জানান, অভিনয় তাঁর প্রথম পছন্দ ছিল না। বরং তিনি চেয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে। তাঁর দাদু স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন এবং ছোটবেলায় বহু বিপ্লবীকে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে দেশসেবার বীজ বপন করেছিল। পাশাপাশি ফুটবলও ছিল তাঁর জীবনের বড় স্বপ্ন। তাঁর কথায়, “ভাবতাম আর্মিতে যোগ দিলে দেশের জন্য কাজও করতে পারব, আবার ফুটবলও খেলতে পারব।” কিন্তু ভাগ্য অন্য রাস্তা তৈরি করে রেখেছিল। এক বন্ধুর সঙ্গে ফটোশুটে গিয়ে হঠাৎ ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো, সেখান থেকে পরিচালক প্রভাত রায়ের নজরে পড়া এই ঘটনাই তাঁর অভিনয়জীবনের শুরু। টোটার মতে, “ঈশ্বর আমাদের পথ আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন, আমরা শুধু সেই পথে হাঁটি।”
অভিনয়জীবনের শুরুর দিকে বড় ভুল সিদ্ধান্তের কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি। টোটা বলেন, হলিউডের ধাঁচে ভেবে তিনি নায়ক, চরিত্রাভিনেতা, খলনায়ক সব ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাংলা ইন্ডাস্ট্রি তখন সেই মানসিকতার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাঁর কথায়, “আমি ভিলেনের চরিত্র করলাম, ছবিটা সুপারহিট হল, কিন্তু তারপর কেউ আর আমাকে হিরো হিসেবে নিতে চাইল না।” এখানেই তিনি বাংলা ইন্ডাস্ট্রির কদর্য বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, একবার যে খোপে ফেলে দেওয়া হয়, সেখান থেকে বেরোনো অত্যন্ত কঠিন। “তুমি হিরো হলে হিরোই থাকবে, ভিলেন হলে ভিলেনই থাকবে এই মানসিকতা তখন খুব প্রবল ছিল,” বলেই জানিয়েছেন অভিনেতা।
সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্যটি আসে বাংলা ছবির কাস্টিং নিয়ে। বহুদিনের প্রচলিত ধারণা ভেঙে টোটা সরাসরি বলেন, “অনেকে মনে করেন প্রডিউসার বা ডিরেক্টর কাস্টিং ঠিক করেন। কিন্তু বাংলা মূলধারার সিনেমায় কাস্টিং ঠিক করে ধর্মতলা স্ট্রিট।” তাঁর ব্যাখ্যা, এখানে ‘ধর্মতলা’ বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ডিস্ট্রিবিউশন ও এক্সিবিশনের সেই বাজারকেন্দ্রিক শক্তিকে, যারা ঠিক করে দেয় কার ছবি চলবে, কে ‘বাজারে বিকোবে’ আর কে নয়। তাঁর দাবি, পরিচালক যদি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন, তবেই হয়তো কোনও অভিনেতা সুযোগ পান। না হলে বাজারের চাহিদাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। এই মন্তব্য বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
রাজনীতি এবং বৃহত্তর সমাজ নিয়েও টোটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বাংলায় প্রতিভার মূল্যায়ন অনেক সময় দেরিতে হয়, বিশেষ করে সর্বভারতীয় স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত। তাঁর বক্তব্য, “যতক্ষণ না সর্বভারতীয় স্তরে ছাপ ফেলতে পারছ, ততক্ষণ আমরা বাঙালিরাও বাঙালিদের উপর পুরো বিশ্বাস করি না।” এই মন্তব্যে তিনি এক ধরনের সামাজিক মানসিকতার দিকেই আঙুল তুলেছেন। যদিও সরাসরি দলীয় রাজনীতি নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি, কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলা এবং সমাজের স্মৃতিভ্রংশতা নিয়ে তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক সুর স্পষ্ট ছিল। তাঁর মতে, যাঁরা দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁদের প্রাপ্য সম্মান সবসময় মেলে না।
আরও পড়ুন: “বদলা নয়, বদল চেয়েছিল মানুষ” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে খোলা চিঠিতে বি’স্ফোরক মৈত্রেয়ী মিত্র! ‘জুজু তত্ত্ব’ থেকে একাধিক ইস্যুতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে তুলোধোনা করে কী বললেন অভিনেত্রী?
ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রসঙ্গে টোটা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি জানান, টেলিভিশনে তাঁর অভিনয় দেখে ঋতুপর্ণ তাঁকে ডেকে পাঠান এবং সেখান থেকেই ‘চোখের বালি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সুযোগ আসে। টোটার ভাষায়, “ঋতুদা শুধু পরিচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার শিক্ষাগুরু।” তিনি বলেন, অভিনয়ের সূক্ষ্মতা, সংলাপ বলার ধরন, চরিত্রের মনস্তত্ত্ব—সবকিছুই ঋতুপর্ণ তাঁকে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর আক্ষেপ, “ঋতুদাকে আরও কয়েক বছর পেলে আরও অনেক কিছু শিখতে পারতাম।” একই সঙ্গে কমার্শিয়াল সিনেমাকে ছোট করে দেখার প্রবণতার বিরুদ্ধেও সরব হন তিনি। টোটার স্পষ্ট বক্তব্য, “কমার্শিয়াল সিনেমায় দর্শককে অসম্ভব পরিস্থিতিও বিশ্বাস করানোই সবচেয়ে কঠিন অভিনয়।” সব মিলিয়ে এই সাক্ষাৎকারে টোটা রায়চৌধুরী শুধু নিজের জীবন নয়, বাংলা সিনেমার অন্দরমহলের অনেক না-বলা সত্য সামনে এনে দিলেন।






