রাজ্যে সরকার বদলের পর থেকেই রাজনৈতিক আবহ যেন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে চায়ের আড্ডা সর্বত্র এখন একটাই আলোচনা, কে কোন মতাদর্শে বিশ্বাসী, কে কাকে সমর্থন করছেন, আর কে কাকে কটাক্ষ করছেন। সাধারণ মানুষ থেকে শিল্পী প্রায় সকলের বক্তব্য নিয়েই তৈরি হচ্ছে বিতর্ক। বিশেষ করে বিনোদন জগতের পরিচিত মুখেরা রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনও মত প্রকাশ করলেই তা ঘিরে শুরু হচ্ছে তুমুল আলোচনা, সমালোচনা এবং কখনও কখনও ব্যক্তিগত আক্রমণও। এই আবহেই অভিনেত্রী মৈত্রেয়ী মিত্র (Maitreyee Mitra)-র একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
দুদিন আগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে উদ্দেশ্য করে একটি দীর্ঘ খোলা চিঠি লেখেন মৈত্রেয়ী। সেখানে তিনি লেখেন, “২০১১ সালে আপনার শপথ গ্রহণের সময় চোখে জল ছিল, সেই জয় শুধু আপনার ছিল না, আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসীর ছিল।” একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তিনি কোনও রাজনৈতিক পতাকার তলায় নেই। কিন্তু এই পোস্টের পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে ‘রং বদলানো’, ‘চটিচাটা’ সহ নানা কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই বিতর্ক নিয়েই মুখ খুলেছেন অভিনেত্রী।
স্পষ্ট ভাষায় তিনি বলেন, “যারা আজকে আমাকে রং বদলাচ্ছে বলছেন, আমি জানতে চাই এর আগে কোন রঙের তলায় আমাকে দেখেছেন?” তাঁর দাবি, তিনি কখনও কোনও রাজনৈতিক দলের ছাতার তলায় ছিলেন না। অভিনেত্রীর কথায়, “আমি যদি কোনও পতাকার তলায় থাকতাম, তাহলে ২৬ মাস কাজ ছাড়া বসে থাকতে হত না।” এখানেই থেমে না থেকে তিনি আরও বলেন, “আমি যদি সুবিধা নিতে চাইতাম, তাহলে এতদিনে অন্তত দু-তিনটে ফ্ল্যাট হয়ে যেত।” নিজের সাধারণ জীবনযাপনের কথাও তুলে ধরেন মৈত্রেয়ী। তাঁর বক্তব্য, “আমার একটাই ছোট ফ্ল্যাট, আমি খুব সাধারণভাবে বাঁচি।”
সাক্ষাৎকারে মৈত্রেয়ী আরও জানান, তিনি রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। তাঁর পরিবারের একাংশ কংগ্রেস, কেউ বামপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সেই কারণেই তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন। তাঁর কথায়, “আমি লুকিয়ে রাজনীতি করব, এমন মানসিকতা আমার নেই। করলে প্রকাশ্যেই করতাম।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, “খারাপকে খারাপ আর ভালোকে ভালো বলব। কোনও দলকে খুশি করার জন্য কথা বলব না।” সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ তাঁর লেখা না বুঝেই সমালোচনা করছেন বলেও অভিযোগ অভিনেত্রীর। তিনি বলেন, “আগে পুরোটা পড়ুন, বুঝুন, তারপর মন্তব্য করুন।” শিল্পীদের নিয়ে হওয়া সমালোচনার প্রসঙ্গেও নিজের মত স্পষ্ট করেছেন মৈত্রেয়ী।
তাঁর মতে, কিছু ক্ষেত্রে শিল্পীদেরও দায় রয়েছে। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন অতিরিক্তভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। অভিনেত্রীর কথায়, “মানুষ শিল্পীদের এত সহজলভ্য মনে করে নিয়েছে যে এখন যা খুশি তাই বলে দিচ্ছে।” তবে একইসঙ্গে তিনি এটাও বলেন, “সব মানুষ একরকম নয়। প্রত্যেকের ভাবনা আলাদা হতে পারে। তাই মত না মিললেই কাউকে অসম্মান করা উচিত নয়।” তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতেও তিনি নিজের মত প্রকাশ করবেন। “কোনও পোস্টে বিজেপিকে সমালোচনা করব, কোনও পোস্টে তৃণমূলকে, কোনও পোস্টে বামফ্রন্টকে, কারণ কথা বলার অধিকার সবার আছে,” বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী।
আরও পড়ুনঃ ‘দিদি গো’ গান গেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় উদযাপন ঊষা উত্থুপের? তৃণমূলের পনেরো বছরের রাজত্বের অবসান! বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলাতেই, ভাইরাল ভিডিও ঘিরে বিতর্কে জড়ালেন বর্ষীয়ান গায়িকা?
কাজের প্রসঙ্গ উঠতেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মৈত্রেয়ী। তিনি জানান, অভিনয়ই তাঁর একমাত্র পেশা এবং সেই কাজ বন্ধ থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ছোটবেলা থেকেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর কথায়, “মাধ্যমিকের পর থেকেই টিউশন করে রোজগার শুরু করি। আমি জানতাম আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।” রাজনীতির খারাপ দিক ছোটবেলা থেকে দেখেছেন বলেও জানান তিনি। তাই আজও তাঁর একটাই চাওয়া “দু’বেলা শান্তিতে খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে চাই। কারও চোখ রাঙানিতে নয়, নিজের সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই।” অভিনেত্রীর এই স্পষ্ট বক্তব্য ঘিরে এখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় জোর চর্চা চলছে।






