আজ বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো ১০২ বছর। বাংলা তথা বিশ্ব সিনেমার অন্যতম উজ্জ্বল নাম পরিচালক মৃণাল সেনকে তাঁর জন্মদিনে স্মরণ করলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা দীপঙ্কর দে। ১৪ মে এই বিশেষ দিনে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তিনি তুলে ধরলেন বহু পুরনো কাজের অভিজ্ঞতা। ‘আকালের সন্ধানে’ ছবিতে এবং দূরদর্শনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘কিতনে দূর কিতনে পাস’-এ একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। সেই সময় খুব কাছ থেকে মৃণাল সেনকে দেখেছেন দীপঙ্কর। তাই আজও তাঁর কাজের ধরণ, মানুষ হিসেবে আচরণ এবং পরিচালনার আলাদা ধরন অভিনেতার মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। জন্মদিনের দিনে সেই স্মৃতিই যেন নতুন করে সামনে এল।
দীপঙ্কর দে বলেন, “আজ মৃণালবাবুর জন্মদিন। এই দিনটায় ওঁর কথা খুব মনে পড়ে। সত্যিই মিস করি মৃণালদাকে।” তিনি আরও জানান, “অদ্ভুত, আশ্চর্য রকমের গুণী শিল্পী ছিলেন তিনি।” অভিনেতার কথায়, মৃণাল সেনের মতো মানুষ খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু পরিচালক ছিলেন না, কাজের মধ্যে আলাদা চিন্তা ও সাহস ছিল। তাঁর সঙ্গে কাজ করা মানেই ছিল নতুন কিছু শেখা। সেটে তিনি কখনও চাপ তৈরি করতেন না, বরং শিল্পীদের স্বাভাবিক ছন্দে কাজ করতে দিতেন। সেই কারণেই তাঁর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা আজও এত মূল্যবান বলে মনে করেন দীপঙ্কর দে।
মৃণাল সেনের কাজের পদ্ধতি নিয়ে বলতে গিয়ে দীপঙ্কর দে সত্যজিৎ রায়ের প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি বলেন, “কোনওদিন দেখিনি আগে থেকে তৈরি চিত্রনাট্যে কাজ করছেন, যেমনটি করতেন সত্যজিৎ রায়।” তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এর মানে এই নয় যে মৃণাল সেন প্রস্তুতি ছাড়া সেটে যেতেন। অভিনেতার কথায়, “তার মানে এই নয় যে ওঁর কাছে কিছুই থাকত না। একটা খসড়া থাকত। কিন্তু বেশিরভাগটাই ‘অন-স্পট’ লেখা হত। ইনপ্রম্পটু হত আর কী…” অর্থাৎ পরিস্থিতি অনুযায়ী শুটিং চলাকালীন দৃশ্য বদলানো বা নতুন ভাবনা যোগ করা ছিল তাঁর স্বভাব। এই স্বতঃস্ফূর্ততাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
অভিনেতা আরও জানান, মৃণাল সেন শিল্পীদের অভিনয়ে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিতেন। শটের আগে শুধু পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়ে বলতেন, “এটা হতে পারে।” তারপর অভিনেতাদের উপরই ভরসা রাখতেন তিনি। তবে দূরদর্শনের ধারাবাহিক ‘কিতনে দূর কিতনে পাস’-এর ক্ষেত্রে কিছুটা নিয়ম বদলাতে হয়েছিল। কারণ টেলিভিশনের কাজ আগে থেকে পরিকল্পনা করে এগোতে হয়, তাই সেখানে স্ক্রিপ্ট তৈরি রাখা জরুরি ছিল। সেই সময়েও মৃণাল সেন নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভাবনাকে ধরে রেখেই কাজ করেছেন। নতুন মাধ্যমের প্রয়োজন বুঝে নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতাও ছিল তাঁর মধ্যে।
আরও পড়ুনঃ “সব সাফ করে দেওয়া হয়েছে, আর কিচ্ছু করার নেই” আইনজীবীর পোশাকে আদালতে হাজির মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিবর্তনের বাংলায় তৃণমূল সুপ্রিমোকে নিশা’না করে বি’স্ফোরক মিঠুন চক্রবর্তী!
স্মৃতিচারণায় উঠে আসে মৃণাল সেনের দীর্ঘদিনের সহযোগী সিনেমাটোগ্রাফার কে কে মহাজনের নামও। দীপঙ্কর দে বলেন, “কে কে মহাজন ওঁর ক্যামেরাম্যান ছিলেন। দুর্দান্ত ক্যামেরা সামলাতেন।” এরপর তিনি যোগ করেন, “মৃণাল সেন এবং কে কে মহাজনের জুটিটা যেন সোনায় সোহাগা ছিল। কী সব কাজ করেছেন তাঁরা একসঙ্গে, ভাবা যায় না!” বর্তমান সময়ের পরিচালকদের প্রসঙ্গ উঠতেই আক্ষেপ শোনা যায় তাঁর গলায়। সপাট প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন তিনি, “এখনকার পরিচালকদের মধ্যে ক’জন সত্যি পরিচালক আর আছে বলুন?” মৃণাল সেনের জন্মদিনে এই মন্তব্য ফের মনে করিয়ে দিল, সময় বদলালেও তাঁর কাজের মূল্য আজও অটুট।






