টলিউডের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং স্পষ্টভাষী অভিনেত্রী অপরাজিতা আঢ্য বরাবরই নিজের অভিনয়ের পাশাপাশি বাস্তব জীবন নিয়ে খোলামেলা মতামতের জন্য দর্শকদের কাছে আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন। পর্দার বাইরেও তিনি বহুবার পরিবার, সম্পর্ক, সমাজ এবং বর্তমান প্রজন্মের নানা জটিলতা নিয়ে অকপটে কথা বলেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকার তিনি আজকের সমাজব্যবস্থা, সন্তান না হওয়া নিয়ে নারীদের উপর চাপ, বর্তমান প্রজন্মের মানসিক পরিবর্তন, পারিবারিক দূরত্ব এবং সম্পর্কের ভাঙন নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। শুধু একজন অভিনেত্রী হিসেবে নয়, একজন নারী, বউমা, স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে এই কথোপকথনে। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল আবেগ, তেমনই ছিল সমাজের বাস্তব ছবির নির্মম সত্য।
শুরুতেই অপরাজিতা নিজের পরিবারকে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমার কাছে অস্কার পাওয়া মানে আমার বিয়ে হওয়া, আমার পরিবার পাওয়া।” অভিনেত্রীর কথায়, জীবনে যত বড় সাফল্যই আসুক না কেন, দিনের শেষে পরিবারের কাছে ফিরে আসাটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় শান্তি। তিনি জানান, কেরিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মুম্বই থেকে একাধিক বড় কাজের সুযোগ এসেছিল। সেই সময় তাঁর শাশুড়িও তাঁকে নিয়ে মুম্বই যাওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি পরিবারকে ছেড়ে যেতে পারেননি। অপরাজিতা বলেন, “আমার কাছে পরিবারটাই প্রায়োরিটি ছিল। আমি কখনও বাইরের সাফল্যকে পরিবারের উপরে রাখিনি।” তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে মানুষ সম্পর্কের চেয়ে সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে ধীরে ধীরে নিজের শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর সেই কারণেই সম্পর্কের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সমাজে সন্তান না হওয়া নিয়ে এখনও যে নারীদের অপমান সহ্য করতে হয়, সেই বিষয়েও অত্যন্ত স্পষ্ট বক্তব্য রাখেন অভিনেত্রী। তিনি বলেন, “বাচ্চা না হওয়াটা এখনও একটা লজ্জা হিসেবে দেখা হয়।” তাঁর মতে, শহরের শিক্ষিত সমাজে হয়তো অনেকেই এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কথা বলেন, কিন্তু শহরের বাইরে এখনও পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। অপরাজিতা নিজের পরিচিত এক মহিলার উদাহরণ দিয়ে জানান, শুধুমাত্র সন্তান না হওয়ার কারণে তাঁকে স্বামীর বাড়ি থেকে মারধর করে বের করে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিনেত্রী বলেন, “একজন মেয়ের পরিচয় শুধু মা হওয়ায় আটকে থাকতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, “সন্তান জন্ম দিলেই বাবা-মা হওয়া যায় না। বাবা-মা হয়ে উঠতে হয় সময়ের সঙ্গে।” তাঁর মতে, সমাজ এখনও নারীর সম্পূর্ণতাকে মাতৃত্বের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে, আর এই ধারণাটাই বদলানো সবচেয়ে জরুরি। একজন নারী মা না হলেও তিনি অসম্পূর্ণ নন, এই বার্তাই স্পষ্টভাবে দিতে চেয়েছেন অপরাজিতা।
বর্তমান প্রজন্ম এবং পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তন নিয়েও গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন অভিনেত্রী। তাঁর মতে, এখনকার বাচ্চারা আগের প্রজন্মের মতো চুপচাপ সব মেনে নেয় না। তারা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে জানে, নিজের স্পেস চায়। কিন্তু সেই স্পেসের চাহিদা এবং প্রযুক্তির অতিরিক্ত প্রভাব অনেক সময় পরিবারকে ভেঙেও দিচ্ছে। অপরাজিতা বলেন, “আমাদের ছোটবেলায় কেউ জিজ্ঞেস করত না কী ভালো লাগছে। এখনকার বাচ্চাদের কাছে চয়েস আছে, বলার জায়গা আছে।” তবে তিনি এটাও মনে করেন, এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় পরিবারে দূরত্ব বাড়ছে। তাঁর কথায়, “মানুষ এখন নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে ব্যস্ত, কিন্তু মানুষ হওয়াটাই ভুলে যাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, এখনকার অনেক তরুণ-তরুণী মানসিক চাপ, একাকীত্ব এবং আসক্তির সমস্যায় ভুগছে, অথচ তারা নিজের সমস্যার আসল কারণটাই খুঁজে পাচ্ছে না। অভিনেত্রীর মতে, পরিবারে কথোপকথন কমে যাওয়াই এই সমস্যার অন্যতম বড় কারণ।
সম্পর্ক নিয়ে তাঁর মন্তব্যও যথেষ্ট বাস্তববাদী। অপরাজিতা বলেন, “সব সম্পর্কেরই এক্সপায়ারি ডেট থাকে।” তাঁর মতে, জীবনে কেউ আসবে, কেউ চলে যাবে এটাই বাস্তব। তাই সম্পর্ক ভাঙলে বা দূরত্ব তৈরি হলে সেটাকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করতে শেখা উচিত। তিনি জানান, তিনি নিজে খুব স্পষ্টভাবে কথা বলতে ভালোবাসেন এবং মিথ্যে বলে কাউকে খুশি করতে বিশ্বাসী নন। “আমি মুখের উপর কথা বলি, জমিয়ে রাখি না,” এই মন্তব্যের মধ্যেই তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা স্পষ্ট। একইসঙ্গে তিনি এটাও বলেন, অনেক সময় মানুষ সত্যিটা সহ্য করতে না পেরে দূরে সরে যায়। তবে সেই নিয়ে তিনি আর জোর করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন না। তাঁর মতে, সম্পর্ক তখনই সুন্দর থাকে যখন সেখানে সম্মান এবং বোঝাপড়া থাকে।
আরও পড়ুনঃ ‘নিঃশ্বাস নিতেও অনুমতি লাগত, শিল্পীদের স্বপ্ন দেখার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল’ টলিউডের অন্দরমহলের বিস্ফো’রক অভিযোগ তুলে কোন পরিবর্তনের ডাক দিলেন রুদ্রনীল ঘোষ? বাংলা শিল্পজগতকে বদলাতে কী বার্তা দিলেন রূপা গাঙ্গুলী?
বর্তমান সমাজের জটিলতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন অভিনেত্রী। তিনি বলেন, “জীবন এত জটিল হয়ে গেছে যে মানুষ মানুষ হওয়াটাই ভুলে যাচ্ছে।” তাঁর মতে, আগে মানুষ অভ্যাসে জীবন কাটাত, এখন মানুষ কমিটমেন্টে বাঁচে। আর এই পরিবর্তনের ফলে মানসিক চাপও বেড়েছে। তবু সমস্ত পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি আশাবাদী থাকার কথা বলেছেন। তাঁর কথায়, “যাই হোক না কেন, রাতে আমি দুটো রুটিই খাব। পরিস্থিতি বদলালেও তিনটে রুটি খাব না।” অর্থাৎ জীবনের লড়াই থেমে থাকে না, মানুষকে নিজের মতো করেই এগিয়ে যেতে হয়। অপরাজিতার মতে, বর্তমান সময়ে পরিবার, সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব নতুন করে বোঝা খুব জরুরি। আর সেই কারণেই তিনি মনে করেন, প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের পরিবারকে সময় দেওয়া, কাছের মানুষদের কথা শোনা এবং সম্পর্কের ভিতকে আরও শক্ত করে তোলা।






