“আমায় ডেকেছিল, সরাসরি না বলেছি তাতেও কাজ হারাইনি” “সবাই শুধু ভয়ে মঞ্চে যাননি, কেউ কেউ দলের কাছাকাছি পৌঁছতেও চেয়েছেন” টলিউড শিল্পীদের ‘ভয়ে রাজনীতি’ তত্ত্বে ভিন্ন সুর ঋত্বিক চক্রবর্তীর! বিরোধিতা করেও, বিজেপি সরকারের কাছে কী দাবি জানালেন তিনি?

১৫ বছর পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। দীর্ঘদিনের তৃণমূল সরকারের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি সরকার। আর সরকার বদলের পর থেকেই শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্র নয়, বাংলা বিনোদন জগতেও একের পর এক রাজনৈতিক সমীকরণ এবং অন্দরমহলের নানা অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করেছে। বহুদিন ধরেই অভিযোগ উঠছিল, টলিউডের একাংশের শিল্পীরা তৃণমূলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। আবার অন্যদিকে, যেসব অভিনেতা-অভিনেত্রী সরাসরি কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তাঁদের অনেক সময় কাজের ক্ষেত্রেও সমস্যার মুখে পড়তে হত বলেও ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে কানাঘুষো শোনা যেত। নতুন সরকার আসার পর সেই চাপা অসন্তোষ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে সামনে আসছে।

এর মধ্যেই আরও একটি বড় অভিযোগ উঠে এসেছে। এতদিন যাঁরা তৃণমূল সরকারের হয়ে প্রচার করেছেন, দলীয় মঞ্চে উপস্থিত থেকেছেন বা সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই এখন দাবি করছেন যে “চাপ” সৃষ্টি করা হতো, যেখানে ডাকা হলে এড়ানোর উপায় ছিল না। এই বিতর্কের আবহে সাধারণ মানুষের কটাক্ষের মুখে পড়েছেন একাধিক পরিচিত মুখ। সেই তালিকায় বারবার উঠে এসেছে পরিচালক রাজ চক্রবর্তী, অভিনেতা দেব, অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। বর্তমানে অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কে নিয়েও রাজনৈতিক মহলে চর্চা কম নয়। ঠিক এই পরিস্থিতিতেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী।

সম্প্রতি ‘ফেরা’ ছবির প্রচারে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে অভিনেতা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, গত ১৫ বছরে তাঁকে মাত্র একবারই কোনও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে ডাকা হয়েছিল এবং তিনি সরাসরি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, “একবার গোটা এই ১৫ বছরে একবারই আমাকে ডাকা হয়েছিল কোনও একটা অনুষ্ঠানে বা কোনও মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে। আমি সরাসরি না বলেছি, তাতেও আমার আলাদা করে কোনও বিপদ তৈরি হয়নি। আর সবচেয়ে বড় কথা দ্বিতীয়বার আর কেউ কোনওদিন বলেনি।”

শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগ না দিলেও তাঁর কাজের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হয়নি বলেও স্পষ্ট দাবি করেন অভিনেতা। ঋত্বিকের বক্তব্য, “ভয় পাওয়ার তেমন কোনও জায়গা নেই।” তবে একইসঙ্গে তিনি এটাও মানতে চাননি যে, যারা রাজনৈতিক মঞ্চে গিয়েছেন তাঁরা সবাই শুধুই ভয়ে গিয়েছেন। তাঁর কথায়, “নিশ্চয়ই কেউ না কেউ চেয়েওছে, কেউ রাজনৈতিক দলের কাছাকাছি পৌঁছতে চেয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোও তাঁদের ব্যবহার করেছে, তারাও নিজেদের মতো ব্যবহার করেছে বা করতে চেয়েছে। নানা রকম পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু যেটা হচ্ছিল সেটা খুব একটা স্বাভাবিক কিছু নয়, উদ্ভট।”

এই মন্তব্য ঘিরেই এখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও বিনোদন মহলে। কারণ, ঋত্বিক কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন যে বাংলা বিনোদন জগতে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার একটি অস্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তাঁর মতে, সেই সময়ে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যেখানে শিল্পী, রাজনীতি এবং ক্ষমতার সম্পর্ক অস্বাভাবিকভাবে মিশে গিয়েছিল।

অভিনেতা আরও বলেন, তিনি কোনওদিনই নিজেকে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করেননি। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “আমি কখনওই কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছিলাম না। ফলে আসারও প্রশ্ন নেই, যাওয়ারও প্রশ্ন নেই।” নতুন সরকার আসার পর আবার শিল্পীদের রাজনৈতিক ব্যবহার শুরু হবে কিনা, সেই প্রশ্নেও নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। ঋত্বিক বলেন, “আবার যদি সেরকম ঘটনা ঘটে তাহলে বলব আবার একটা উদ্ভট পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।” একইসঙ্গে নতুন সরকারের কাছে তাঁর প্রত্যাশাও স্পষ্ট। অভিনেতার কথায়, “একটা সরকার বা রাজনৈতিক দলের কাজই হচ্ছে একটা ভয়হীন সমাজ তৈরি করা।” তিনি মনে করেন, শিল্পীদের যেন স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ থাকে, সেটাই সবচেয়ে জরুরি। তাঁর বক্তব্য, “সবকিছুর রাজনীতিকরণ হয়ে গিয়েছিল। একটা সাধারণ কথাও রাজনৈতিক হয়ে যাচ্ছিল।”

সাক্ষাৎকারে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সেখানেও নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই উত্তর দেন ঋত্বিক। তিনি বলেন, “জবাবদিহি করি না। জবাব দিই যখন ইচ্ছে করে।” এমনকি ট্রোল বা সমালোচনা নিয়ে তাঁর খুব একটা মাথাব্যথা নেই বলেও জানান অভিনেতা। তাঁর কথায়, “আমার ইমেজটা মানুষ কি ভাবল সেটা নিয়ে আমি নতুন করে অন্য মানুষ হতে পারব না।” শুধু রাজনীতি নয়, ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন অভিনেতা। ছেলে মানুষ করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জীবনে সবকিছু পাওয়া যায় না, সেই শিক্ষাটা ছোট থেকেই দেওয়া দরকার। ঋত্বিকের কথায়, “আমার ছেলে আজ যা যা চাইছে আমি হয়তো ১০০টাই দিতে পারি। কিন্তু ৮০টা দিলেও অসুবিধা নেই। ওর জানা থাকবে যে জীবনে চাইলেও সব পাওয়া যায় না।”

আরও পড়ুনঃ “তৃণমূল ভোটের টিকিট দিতে চেয়েছিল, আমি নিইনি” “আরজি কর আর এসএসসি কাণ্ড ভুলে ওই দলের হয়ে রাজনীতি করব না” ভোটের আগে তৃণমূলের প্রচার, তবু বিধায়কের প্রস্তাবে না পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের! মমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ভরাডুবির পর তারই করছেন সমালোচনা?

অভিনেতার এই স্পষ্ট বক্তব্য এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। বিশেষ করে যখন টলিউডের একাংশের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে, তখন ঋত্বিক চক্রবর্তীর এই মন্তব্য অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর কথায় যেমন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনই রয়েছে শিল্পীদের স্বাধীনতা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থানও।

You cannot copy content of this page