“ইন্ডাস্ট্রিতে সারাক্ষণ অশান্তি…. ‘শঙ্খচিল’-এর পর আর বাংলা ছবিতে কাজ করিনি” ইম্পা’তে রাজনৈতিক রং লেগেছে! বিতর্কিত মন্তব্য জাতীয় পুরস্কারজয়ী গৌতম ঘোষের

বাংলার বিনোদন জগতে অশান্তির আবহ যেন কাটছেই না। রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই টলিপাড়ার বিভিন্ন সংগঠন এবং শিল্পীমহলের ভিতরে বিভাজনের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। তারই নতুন অধ্যায় এখন ইম্পা বা ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশনকে ঘিরে। সংস্থার সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তর পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়েছেন প্রযোজক ও পরিবেশকদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, বাংলা চলচ্চিত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের উপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রভাব বেড়ে গিয়েছিল প্রাক্তন সরকারের আমলে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইন্ডাস্ট্রির কাজের পরিবেশে। সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে প্রযোজনার সংকট সব মিলিয়ে এমনিতেই চাপে রয়েছে বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ। তার মধ্যে সংগঠনের ভিতরে চলা এই টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

এই আবহেই দীর্ঘদিন পর ইম্পায় হাজির হতে দেখা গেল জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক গৌতম ঘোষ (Goutam Ghose)-কে। একসময় বাংলা সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা হলেও, ‘শঙ্খচিল’-এর পর আর তাঁকে সেভাবে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে দেখা যায়নি। বরং তিনি ঝাড়খণ্ডে ছবি করেছেন, বিদেশি প্রযোজনার সঙ্গে যৌথ কাজেও যুক্ত থেকেছেন। সম্প্রতি, ইম্পায় এসে গৌতম ঘোষ স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেন, বাংলা ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি তাঁকে হতাশ করেছে। তাঁর কথায়, আগে যে পরিবেশ ছিল, এখন আর তা নেই। সেই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে ইম্পায় আসাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি বাংলা ছবির কাজ থেকেও অনেকটা দূরে সরে গিয়েছেন বলেই ইঙ্গিত দেন পরিচালক।

গতকাল অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের বৈঠকে পিয়া সেনগুপ্ত বা তাঁর কমিটির সদস্যদের কাউকেই দেখা যায়নি। তাঁদের অনুপস্থিতিতেই সংগঠনের চার কমিটির সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন বিরোধীপক্ষের প্রযোজকরা। সেখানেও পিয়া সেনগুপ্তর পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকেন তাঁরা। যদিও এতদিন এই আন্দোলনে বড় কোনও প্রযোজককে প্রকাশ্যে দেখা না যাওয়ায় প্রশ্ন উঠছিল। সেই প্রসঙ্গে পরিবেশক শতদীপ সাহা বারবার দাবি করেছেন, ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই নেপথ্যে তাঁদের সমর্থন করছেন। তবে গৌতম ঘোষের উপস্থিতি এই আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলেই মনে করছে টলিপাড়া। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পরিচালক বলেন, বাংলা ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ আগের মতো নেই। সর্বক্ষণ অশান্তি চলতে থাকলে কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়, আর তার প্রভাব পড়ে গোটা শিল্পের উপর।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারেও একই সুর শোনা গিয়েছে তাঁর গলায়। গৌতম ঘোষ জানিয়েছেন, একসময় ভিনরাজ্যের প্রযোজক-পরিচালকেরা বাংলায় কাজ করতে আগ্রহ দেখাতেন। কিন্তু এখন ইন্ডাস্ট্রির অশান্তির খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই আর এখানে কাজ করতে চাইছেন না। তাঁর কথায়, “আমাদের সময় ইম্পা ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ ট্রেড বডি। কিন্তু এখন নানা রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে। কেউ বলছে তুমি ওই দলের, কেউ বলছে তুমি এই দলের। এগুলো একেবারেই থাকা উচিত নয়।” তিনি আরও বলেন, বাংলা ছবির বাজারও ভয়াবহ সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। একসময় বাংলায় প্রায় ৮৫০টি সিনেমা হল ছিল, অথচ এখন সেই সংখ্যা কমতে কমতে কোথায় নেমেছে তা নিয়েই সংশয় রয়েছে। ফলে ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে হলে আগে নিজেদের মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন বলেই মত তাঁর।

আরও পড়ুনঃ “সেদিন খরাজ মুখোপাধ্যায় মা’রাই যেত…” বললেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়! অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকাল মৃ’ত্যুর আবহে কোন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বললেন অভিনেতা?

বিরোধীপক্ষের প্রযোজকদের অভিযোগ, ইম্পার গায়ে ক্রমশ রাজনৈতিক রং লেগে যাচ্ছে এবং সেটাই বর্তমান সমস্যার অন্যতম কারণ। গৌতম ঘোষও মনে করেন, বিনোদন জগত যত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ থাকবে, ততই তার পক্ষে ভালো। কোনও সংগঠনকে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ফেললে শিল্পের ক্ষতি হয় বলেই তাঁর মত। বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর উদ্বেগ স্পষ্ট। কারণ তাঁর মতে, এমনিতেই আর্থিক সংকট, হল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং দর্শক কমে যাওয়ার মতো সমস্যায় জর্জরিত এই ইন্ডাস্ট্রি। তার মধ্যে যদি সংগঠনের ভিতরেই বিভাজন ও অশান্তি চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে বাংলা সিনেমার অবস্থা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

You cannot copy content of this page