“আমাকে সবাই বলে ওই দেখ সলিল চৌধুরীর মেয়ে…” অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও স্বামীর পাশে ছিলেন, জনপ্রিয়তা আসতেই প্রথম স্ত্রী ও তিন কন্যাকে ত্যাগ করেন সুরকার! ‘দিদিদের গান ছিনিয়ে তোমায় দিত মা’, ‘বাবার পা’পেই জনপ্রিয়তা পেলে না’ অন্তরা চৌধুরীকে কটা’ক্ষ নেটপাড়ার! ফের চর্চায় জ্যোতি চৌধুরীর আত্মত্যাগের গল্প?

বাঙালির গর্ব, কিংবদন্তি সুরকার ও গীতিকার সলিল চৌধুরী (Salil Chowdhury)-র অনবদ্য সৃষ্টি কথা ভোলার নয়। তবে, ব্যক্তিগত জীবন কিন্তু ততটাই বিতর্কিত বলা চলে তাঁর! দ্বিতীয়পক্ষের কন্যা অন্তরা চৌধুরী (Antara Chowdhury) সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ছোটবেলার নানান স্মৃতি ভাগ করে নেন, আর এতেই পর্যায়ে চলে আসে বিতর্কিত অধ্যায়! মূলত ‘বুলবুল পাখি’, ‘খুখুমনি গো’-এর মতো জনপ্রিয় শিশু সঙ্গীতের জন্য পরিচিত অন্তরা বলেন, “আমাকে সবাই বলে ওই দেখ সলিল চৌধুরীর মেয়ে…প্রথমবার যখন ‘বুলবুল পাখি’ গানটা রেকর্ড করলাম, বাবা আনন্দে আমায় কোলে তুলে নিয়েছিল।” তিনি আরও জানান, প্রতিটি গান গাওয়ার পর বাবার কাছে কোলে ওঠার আবদার করতেন।

তাঁর কথায়, “বাবা খুব ভালোবাসতেন তাঁর মেয়েকে। তবে, একটু বড় হওয়ার পরেও কোলে ওঠার বায়না করলে বাবা একটু অস্বস্থি বোধ করতেন…” সাক্ষাৎকারের এই অংশ সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই, প্রশংসার পাশাপাশি পুরনো পারিবারিক সম্পর্ক ও অতীত জীবন নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়! ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসার পর অনেকেই সলিল চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সমাজ মাধ্যমে একাধিক মন্তব্যে দাবি করা হয়েছে, অন্তরার মা তথা বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সবিতা চৌধুরী (Sabita Chowdhury)-র জন্যই নাকি প্রথম স্ত্রী ও তিন কন্যাকে ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন সলিল! কেউ লিখেছেন, “প্রথম বৌ থাকতে আর একটা বিয়ে করতে হল। জানি উনি বিখ্যাত মানুষ। আগের পক্ষের দিদিরা কেমন আছে একটু বলো!”

আবার অন্য এক নেটিজেনের মন্তব্য, “তোমার মা কীভাবে তোমার বাবাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল তার অনেক গুণী প্রথম স্ত্রীর থেকে, সেটা জানো?” কেউ কেউ আরও অভিযোগ করেছেন, প্রথম পক্ষের মেয়েরা যাতে গান গাইতে না পারেন, সেই কারণেই নাকি ছোটবেলায় অন্তরাকে দিয়ে গান গাওয়ানো হত। এমনকি “পুজোর গন্ধ এসেছে” গান নিয়েও নানান দাবি সামনে এসেছে। আরও একজন লিখেছেন, “বাবার পাপে পরের পক্ষের দুটো মেয়েই ভালো গান করা সত্বেও সেভাবে জনপ্রিয়তা পেলোনা।” অন্যজন লেখেন, “তোমার কথা গুলো শোনার পর মনে পড়ে, বাবার আরও তিনটি মেয়ে আছে এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রথম স্ত্রী তোমার বাবার জীবনে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে বলে ডিভোর্স দেননি।”

এদিকে কেউ বলেছেন, “তুমি এমন কিছু নামী গায়িকা নও, তোমার মা কিভাবে প্রথম পক্ষের মেয়েরা যাতে না গাইতে পারে তাই সব গান ছিনিয়ে নিয়ে তোমায় দিত সেই গল্পটা আমাদের জানা আছে!” আরও একজন বলেছেন, “বাবার পাপে পরের পক্ষের দুটো মেয়েই জনপ্রিয়তা পেলোনা। এটাই হয়!” এই মন্তব্যগুলির জেরেই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে সলিল চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী জ্যোতি চৌধুরীর জীবনসংগ্রাম। আসলে সলিল চৌধুরীর জীবনের শুরুর লড়াইয়ে বড় ভূমিকা ছিল তাঁর প্রথম স্ত্রী জ্যোতি চৌধুরী (Jyoti Chowdhury)-র। কলকাতার ভবানীপুরের এক সমৃদ্ধ পরিবারের মেয়ে ছিলেন তিনি। একসময় সলিলের কাছে দর্শন পড়তেন জ্যোতি। কলকাতার আর্ট কলেজে অঙ্কনের ছাত্রী ছিলেন তিনি। সেই শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পর্ক থেকেই প্রেমের শুরু।

কিন্তু তখন সলিল চৌধুরীর আয় খুব বেশি ছিল না। তাই পরিবারের তরফে এই সম্পর্ক মেনে নেওয়া হয়নি। তবু ১৯৫৩ সালে বাড়ির অমতে বিয়ে করেন জ্যোতি। পরে স্বামীর সঙ্গে তৎকালীন বম্বে শহরে চলে যান। সলিলকে প্রতিষ্ঠিত সুরকার হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রথম জীবনে সংসারে আর্থিক সমস্যা থাকায় নিজেই চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন শুরু করেন। ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন জ্যোতি। নিজের উপার্জনের টাকায় বান্দ্রার পেরি ক্রস রোডে বাড়িও কিনেছিলেন তিনি। সেই বাড়ির নাম দিয়েছিলেন ‘সুরছায়া’। সলিল চৌধুরী যখন সবিতা চৌধুরীকে বিয়ে করেন, তখন তিন মেয়ে অলকা, তুলিকা ও লিপিকাকে নিয়ে একাই সংসারের দায়িত্ব সামলান জ্যোতি।

আরও পড়ুন: “নতুন প্রজন্ম কমিটমেন্ট চায় না, ওরা ভুল নয়…আজকের যুগ যেমন, মানুষকেও তেমনভাবে চলতে হবে” দু’দিনের জীবন, সবাই আনন্দ নিয়ে বাঁচতে চায়! ঘনঘন সঙ্গী বদল, সম্পর্ক, বিয়ে ও বিচ্ছেদ নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মানসিকতাকে সমর্থন জানিয়ে খোলামেলা মন্তব্য অভিনেত্রী রচনা ব্যানার্জির!

ছয়ের দশকে সিঙ্গল মাদার হিসেবে মেয়েদের মানুষ করা সেই সময়ে মোটেই সহজ ছিল না। দাম্পত্য ভেঙে যাওয়ার পরেও জ্যোতি চৌধুরী ভেঙে পড়েননি। নিজের কাজ, শিল্পচর্চা এবং সন্তানদের নিয়েই নতুন জীবন গড়ে তুলেছিলেন। পরিচিত মহলের মতে, সলিল চৌধুরীর সাফল্যের পিছনে তাঁর প্রথম জীবনের সংগ্রামে জ্যোতির অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অথচ জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। তবুও প্রকাশ্যে কখনও তিক্ত মন্তব্য করতে শোনা যায়নি তাঁকে। বরং নিজের মতো করেই জীবন কাটিয়েছেন তিনি। অবশেষে ২০২৩ সালের ৭ জানুয়ারি মুম্বইয়ের বান্দ্রার বাড়িতে প্রয়াত হন জ্যোতি চৌধুরী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। তাঁর জীবন এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে মূলত অন্তরা চৌধুরীর সাক্ষাৎকার ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের কারণেই। সেই বিতর্কের মধ্যেই অনেকেই স্মরণ করছেন এক নারীর দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার গল্প।

You cannot copy content of this page