‘আমাদের যেটা প্রাপ্য, সেটাই তো পাচ্ছি, আমার মনে হচ্ছে মানুষ বিশ্বাস রাখছেন…’ সোনাম ওয়াংচুকের আন্দোলন থেকে নাবালিকা ধ*র্ষণ, দেশে কর্মসংস্থানের সংকট থেকে টলিউডের দুর্নী’তি! বর্তমান সমাজের মূল্যবোধ নিয়ে কেন এত ক্ষু’ব্ধ ঋত্বব্রত মুখোপাধ্যায়? কীভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নিচ্ছেন মানুষ, সমাজব্যবস্থা নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুললেন তরুণ অভিনেতা?

তারকা শিল্পীদের বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাঁরা শুধু বিনোদনের জগতের মুখ নন, সমাজ ও সময়ের প্রতিচ্ছবিও বটে। তাই কোনও অভিনেতা যখন বর্তমান সমাজ, রাজনীতি, শিল্পজগতের সংকট কিংবা মানুষের মূল্যবোধ নিয়ে সরাসরি মুখ খোলেন, তখন তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চর্চা শুরু হয়। সম্প্রতি নিজের নতুন ওয়েব সিরিজ ‘ভার্জিনপুর’-এর প্রচারে এসে অভিনেতা ঋত্বব্রত মুখোপাধ্যায় সমাজের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অকপটে নিজের মতামত তুলে ধরলেন। তাঁর কথায় উঠে এল কর্মসংস্থানের সংকট, শিল্পীদের দুরবস্থা, সমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয়, ধর্ষণের ঘটনা থেকে শুরু করে দিল্লির চলমান ছাত্র আন্দোলন ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়েও তাঁর স্পষ্ট অবস্থান।

বর্তমান সমাজে মানুষ কোন বিষয় নিয়ে সরব হন আর কোন বিষয়ে নীরব থাকেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঋত্বব্রত। দিল্লিতে ছাত্র আন্দোলন, সোনাম ওয়াংচুকের আন্দোলন এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা ঘটনাগুলির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সেই দেশেই আমরা সোনাম ওয়াংচুকের এই পরিস্থিতি দেখছি, সেই রাজ্যেই আমরা নাবালিকা ধর্ষণের ঘটনা দেখছি। অথচ সোনাম ওয়াংচুক নিয়ে এত আনমুভড মানুষ রয়েছে, তারাই হয়তো উইকএন্ডে বসে ‘থ্রি ইডিয়টস’ দেখে বলেন উনি সত্যিকারের একজন মানুষ।” তাঁর মতে, সামাজিক মাধ্যমে মানুষ অনেক সময় নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করলেও বাস্তবের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়গুলিতে সেই সংবেদনশীলতার অভাব স্পষ্ট।

তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হচ্ছে মানুষ বিশ্বাস রাখছেন এবং আমাদের যেটা প্রাপ্য, আমরা সেটাই পাচ্ছি। এক চুল কম পাচ্ছি না, এক চুল বেশি পাচ্ছি না।” অভিনেতা সমাজে কর্মসংস্থানের সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর কথায়, “সার্বিকভাবে পুরো দেশে চাকরি নেই, যদিও বলা হয়েছে সবাইকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে চাকরি দেওয়া হবে।” সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সকলের হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট পৌঁছে যাওয়ায় অনেকেই দ্রুত পরিচিতি পাওয়ার লক্ষ্যে কমেডি, কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা অভিনয়ে ঝুঁকছেন বলে তাঁর মত। কিন্তু এর ফলে আসল শিল্প ও শিল্পীদের মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া এবং ভাইরাল হওয়ার নেশাটা আমাদের মূল্যবোধকে ঘেঁটে দিয়েছে।”

একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে ঋত্বব্রত জানান, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বহু শিল্পী ও কারিগরের কাজ চলে যেতে পারে। তাঁর কথায়, “বিগত সাত-আট মাসেই যে প্রভাব পড়েছে, কয়েক বছরের মধ্যে এটা সাংঘাতিক একটা প্রভাব ফেলতে চলেছে।” টলিউড ইন্ডাস্ট্রির পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়েও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অভিনেতা। রাজনৈতিক পালাবদলের পর শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের কাজের পরিবেশ বদলাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমি খুব আশাবাদীও নই, আবার হতাশও নই। আমি খুব নিউট্রাল।” তবে দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রির বহু প্রতিভাবান মানুষের ক্ষতি হতে দেখেছেন বলেও জানান তিনি।

ঋত্বব্রতের কথায়, “ট্যালেন্টেড পরিচালক, প্রযোজক, লেখক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্যামেরাম্যান, টেকনিশিয়ান অনেককে কাজ হারাতে দেখেছি। অনেককে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে যেতে হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “কারও কাছ থেকে কার্ড করে দেওয়ার নামে নগদ টাকা চাওয়া হয়েছে। এত বন্ধু-বান্ধবকে প্রফেশন চেঞ্জ করতে হয়েছে যে এই বিষয়টা নিয়ে আজও আমার ভীষণ কষ্ট হয়।” একজন দৈনিক মজুরিভিত্তিক টেকনিশিয়ানের তিন মাস কাজ না পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ইন্ডাস্ট্রির এই ক্ষত খুব সহজে মুছে যাওয়ার নয়। সবশেষে ঋত্বব্রত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে এক গভীর সামাজিক বার্তা।

আরও পড়ুনঃ “এদের জন্য আমি নিজেকে তিলে তিলে ফুরিয়ে ফেললাম…কেউ সেদিন আমায় বাঁচাতে এল না, টুঁ শব্দও করল না!” সত্যিই কি আ’ত্মহ*ত্যার চেষ্টা করেছিলেন উত্তম কুমার? জীবনের শেষ দিকে কেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি? ৪৭ বছর পর, মহানায়কের মৃ’ত্যুবার্ষিকীতে বি*স্ফোরক সব তথ্য সামনে আনলেন বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়!

তাঁর মতে, মানুষ ক্রমশ বাস্তবের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। মূল্যবোধ, সংবেদনশীলতা এবং প্রকৃত শিল্পের প্রতি সম্মান এই তিনটিই আজ বড় সংকটে। তবে তিনি এখনও আশা হারাতে চান না। শিল্প, সমাজ এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবর্তন যদি আসতেই হয়, তবে তা কেবল রাজনৈতিক পালাবদলের মাধ্যমে নয়, মানুষের চিন্তাভাবনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়েই আসতে হবে। তাঁর এই অকপট মন্তব্যগুলি আবারও মনে করিয়ে দিল, শিল্পীরা শুধু পর্দার চরিত্র নন, তাঁরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষকও।

You cannot copy content of this page