মাত্র ৬ বছর বয়সেই বদলে গিয়েছিল জীবন! মায়ের এক সিদ্ধান্তই ছোট্ট মেয়ের জীবনে ওঠে ঝড়! তারপর কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন আজকের লড়াকু মানসী সিনহা?

মাত্র তিন বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে অভিনয় জগতে পা রাখা। মা-ই ছিলেন প্রথম অভিনয়ের শিক্ষিকা। থিয়েটারের মঞ্চে যখন প্রথমবার দাঁড়িয়ে ছিলেন অভিনেত্রী, বুঝেছিলেন ভালোবাসা কাকে বলে। সেই ভালোবাসা আঁকড়ে আজও নিজের সেরাটা দিয়ে চলেছেন, অভিনেত্রী মানসী সিনহা (Manasi Sinha)। শুধু যে অভিনয় তা নয়, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেও যথেষ্ট জনপ্রিয় তিনি। বামপন্থী ধারণায় বিশ্বাসী অভিনেত্রী, ইন্ডাস্ট্রিতে অত্যন্ত স্পষ্টবাদী হিসেবেই পরিচিত। অন্যায় দেখলে কোনদিনও চুপ থাকেন না তিনি। অন্যরা যেখানে কাজ হারানোর ভয় পায়, তিনি প্রতিবাদ টাকে প্রধান কর্তব্য বলে মনে করেন।

রাজ্যে পালাবদলের আবহে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের অজানা সংগ্রামের কথা তুলে ধরলেন অভিনেত্রী। পর্দায় তাঁর দৃঢ় ব্যক্তিত্ব অনেকের কাছেই পরিচিত হলেও, বাস্তব জীবনের লড়াই যে আরও কঠিন ছিল, সেই কথাই অকপটে জানিয়েছেন তিনি। মানসীর কথায়, তাঁর লড়াই করার মানসিকতা কোনওদিন হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ছোটবেলা থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। সেই অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তাঁকে শক্ত করেছে। অভিনেত্রী জানান, তাঁর শিকড় উত্তর কলকাতার এক সাধারণ পরিবারে। সেখান থেকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা পেয়েছেন। আর সেই শিক্ষার কেন্দ্রে ছিলেন তাঁর মা। মানসীর স্পষ্ট বক্তব্য, আজ তিনি যেখানেই পৌঁছন না কেন, তার পিছনে মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি।

সাক্ষাৎকারে নিজের পরিবার নিয়ে বলতে গিয়ে মানসী বলেন, “উত্তর কলকাতায় আমার মামার বাড়ি। সেই বাড়িতেই আমার মায়ের জন্ম।” তিনি জানান, তাঁর মা ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী এবং আত্মসম্মানী একজন মানুষ। সেই প্রসঙ্গেই আবেগঘন গলায় অভিনেত্রী বলেন, “আমার মা ভীষণ সোজাসাপটা, মাথা উঁচু করে বাঁচতে জানতেন। সত্যি বলতে কী, আমি আমার মায়ের নখের যোগ্যও নই।” শুধু মা নন, তাঁর বাবাও খুব পরিষ্কার মনের মানুষ ছিলেন বলেই জানান মানসী। তবে খুব অল্প বয়সেই জীবনের কঠিন পরিস্থিতি দেখতে হয় তাঁকে। মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে যায়। সেই সময়ের স্মৃতি এখনও তাঁর মনে স্পষ্ট হয়ে রয়েছে। ছোট বয়সেই পরিবার ভাঙার কষ্ট তাঁকে ভিতর থেকে বদলে দিয়েছিল।

মানসী জানান, বিচ্ছেদের পর তাঁর বাবা সংসারের খরচের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মা সেই সাহায্য নিতে রাজি হননি। আত্মসম্মানকে সবচেয়ে বড় করে দেখেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজের লড়াই নিজেই লড়বেন। অভিনেত্রীর কথায়, তাঁর মা স্পষ্ট বলেছিলেন, “যখন তুমি চলে যাচ্ছ, তখন তোমার থেকে টাকা নেব না।” এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই তাঁদের জীবনে শুরু হয় কঠিন সময়। আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়েই দিন কাটাতে হত। সংসার চালানোর জন্য তাঁর মাকে প্রতিদিন নতুন করে সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেই সময় খুব কাছ থেকে মায়ের লড়াই দেখেছেন মানসী। তিনি বুঝেছিলেন, আত্মসম্মান ধরে রেখে জীবন চালানো কতটা কঠিন হতে পারে। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনের ভিত গড়ে দেয়।

অভিনেত্রী আরও জানান, তাঁর মা শুধু সংসার সামলাতেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান মানুষও। মানসীর কথায়, তাঁর মা খুব সুন্দর নাচ করতেন এবং অভিনয়ও জানতেন। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দেয়নি। ছোট্ট মানসী তখন থেকেই মায়ের কষ্ট বুঝতে শুরু করেন। তিনি দেখেছেন, কীভাবে প্রতিদিন লড়াই করে তাঁর মা সংসার টিকিয়ে রেখেছেন। সেই দৃশ্যই তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ধীরে ধীরে তাঁর মনে একটাই ইচ্ছে তৈরি হয়, তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। শুধু নিজের জন্য নয়, মায়ের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর জন্যও কিছু করতে হবে। সেই দায়বদ্ধতাই তাঁকে জীবনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ “বদলে গীতা দে-র পাও টিপতে হয়েছে আমায়” টলিউডে টিকে থাকতে অনেক কটাক্ষ, লাঞ্ছনা সহ্য করে আর কী কী করতে হয়েছিল অনামিকা সাহাকে? সেই স্মৃতি ভুলতে পারেননি আজও! বহু অপমানের পর মুখ খুললেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী?

আজকের সফল অভিনেত্রী মানসী সিনহার কথায় পরিষ্কার, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কোনও বাইরের মানুষ নন, তাঁর নিজের মা। জীবনের কঠিন সময়, আর্থিক টানাপোড়েন এবং পারিবারিক ভাঙনের মধ্যেও যেভাবে তাঁর মা মাথা উঁচু করে বেঁচে ছিলেন, সেটাই তাঁকে লড়াইয়ের শক্তি দিয়েছে। মানসী মনে করেন, ছোটবেলায় দেখা সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁকে মানসিকভাবে দৃঢ় করেছে। তিনি বুঝেছিলেন, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, হার মানলে চলবে না। নিজের পরিচয় নিজেকেই তৈরি করতে হয়। তাঁর এই অভিজ্ঞতা আজ বহু মানুষের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এটি এমন এক নারীর কাহিনি, যিনি আত্মসম্মানকে আঁকড়ে ধরে জীবনের প্রতিটি লড়াই জিতে নিয়েছেন।

You cannot copy content of this page