উত্তম কুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে কাঁপিয়েছিলেন বাংলা সিনেমার পর্দা, বলিউড থেকেও এসেছিল ডাক! তবুও জীবনের শেষবেলায় নিঃশব্দে অন্ধকারেই হারিয়ে যান, স্বর্ণযুগের অভিনেত্রী সবিতা চ্যাটার্জি! একের পর এক কালজয়ী ছবি উপহার দেওয়ার পরেও কেন অধরাই থেকে গেল তাঁর প্রাপ্য সম্মান?

বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে এমন বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন, যাঁরা এক সময় নিজেদের অসাধারণ অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়েছেন পর্দার আড়ালে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের নামও অনেক সময় অজানা থেকে যায়। তবুও কিছু শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং সংগ্রামের গল্প আজও মানুষের মনে আলাদা জায়গা করে রয়েছে। তেমনই এক কিংবদন্তি অভিনেত্রী ছিলেন সবিতা চট্টোপাধ্যায়। ২০১৯ সালে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও বাংলা সিনেমাপ্রেমীরা আজও তাঁকে ভুলতে পারেননি। প্রধান চরিত্র হোক বা পার্শ্বচরিত্র প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ রেখে গিয়েছেন।

১৯৩৭ সালের ১৫ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন সবিতা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বাবা ক্ষিতিশ চট্টোপাধ্যায় এবং মা শান্তিলতা চট্টোপাধ্যায়। বাবার বদলির চাকরির কারণে ছোটবেলায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে তাঁর জীবন। তবে খুব অল্প বয়সেই এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা তাঁর জীবনকে ওলটপালট করে দেয়। তুফান মেলের লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় তিনি নিজের ভাই এবং এক বোনকে হারান। সেই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান অভিনেত্রী। দীর্ঘ দেড় বছর বেনারস ও কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাটাতে হয় তাঁকে। জীবনের সেই কঠিন সময় তাঁকে ভেঙে দিলেও হার মানাতে পারেনি।

অভিনয়ের জগতে তাঁর প্রবেশও ছিল বেশ ঘটনাবহুল। একবার কলকাতার একটি নামী ক্লাবে গান গাইছিলেন তিনি। সেই সময় পরিচালক সুধীর মুখোপাধ্যায় তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন। তখন সুধীরবাবু ‘পাশের বাড়ি’ ছবির জন্য যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি সবিতা চট্টোপাধ্যায়কে নিজের ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। যদিও তখন পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন অভিনেত্রী। পরে ১৯৫৪ সালে ‘আজ সন্ধ্যায়’ ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। সেই ছবিতে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন রাজা মুখোপাধ্যায়। এরপর ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমার অত্যন্ত পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।

ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গেও একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন সবিতা চট্টোপাধ্যায়। ‘একটি রাত’, ‘পুনর্মিলন’, ‘পুত্রবধূ’, ‘যাত্রা হলো শুরু’-র মতো ছবিতে তাঁদের জুটি দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। শুধু উত্তম কুমারই নয়, অভিনেতা অসীম কুমার, অসিত বরণ-সহ আরও বহু জনপ্রিয় অভিনেতার বিপরীতেও অভিনয় করেছেন তিনি। নায়িকা চরিত্রের পাশাপাশি পার্শ্বচরিত্রেও সমান দক্ষ ছিলেন সবিতা। ‘মা ছিন্নমস্তা’, ‘খেলা ভাঙার খেলা’, ‘শুভরাত্রি’, ‘শপথ নিলাম’, ‘মান রক্ষা’, ‘ন্যায়দণ্ড’, ‘জন্মতিথি’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের মনে গেঁথে রয়েছে। বাংলা সিনেমার পাশাপাশি বলিউডেও কাজ করেছিলেন তিনি। অসিত সেন পরিচালিত ‘পরিবার’ ছিল তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি। এমনকি রাজ কাপুরের কাছ থেকেও হিন্দি সিনেমার প্রস্তাব পেয়েছিলেন অভিনেত্রী, যদিও শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি।

আরও পড়ুনঃ “একেবারে নরক, মহিলাদের…” হাজার হাজার টাকার টিকিট কেটেও চরম অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা! কলকাতা বিমানবন্দরের কর্মীরা বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে সরব ইমন চক্রবর্তী! সোশ্যাল মিডিয়ায় কী নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিলেন গায়িকা?

ব্যক্তিগত জীবনে চিত্রনাট্যকার ও সাংবাদিক গৌরাঙ্গ প্রসাদ বসুকে বিয়ে করেছিলেন সবিতা চট্টোপাধ্যায়। বিয়ের পর তিনি সবিতা বসু নামেও পরিচিতি পান। তাঁদের এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। জীবনের শেষ পর্যায়েও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালে ‘সুরের আকাশ’ ছবিতে শেষবার অভিনয় করতে দেখা যায় তাঁকে। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে উত্তম কুমার পুরস্কারে সম্মানিত করে। তবে ২০১৯ সাল থেকেই শারীরিক অসুস্থতা বাড়তে শুরু করে অভিনেত্রীর। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালের ৪ জুলাই প্রয়াত হন বাংলা সিনেমার এই স্বর্ণযুগের তারকা। কিন্তু আজও তাঁর অভিনয়, সংগ্রাম এবং জীবনের গল্প বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে অমলিন হয়ে রয়েছে।

You cannot copy content of this page