“অভিনেত্রীর জীবনটাই যেন এক সিনেমার গল্প!” শাশুড়ির চোখে ছিলেন ‘খারাপ লাইনের মেয়ে’, পর্দায় ‘আদর্শ মা’ হলেও বাস্তবে কোনদিন মা হওয়ার সুখ পাননি! অসংখ্য ক’ষ্ট আর নিঃশব্দ সংগ্রাম পেরিয়ে কীভাবে আজও হাসিমুখে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন মৌসুমী সাহা?

পর্দার সামনে যাদের আমরা প্রতিদিন দেখি, তাদের জীবনের গল্প সবসময়ই আলো ঝলমলে হয় না। ক্যামেরার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে না বলা কষ্ট, লড়াই, অপমান আর নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার এক অসম সাহস। অনেক শিল্পীই ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময় পার করেও মুখে হাসি রেখে দর্শকদের আনন্দ দিয়ে গিয়েছেন বছরের পর বছর। কেউ সংসারের চাপে থেমে গিয়েছেন, কেউ আবার সব বাধা পেরিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। আর সেইরকমই এক নিঃশব্দ সংগ্রামের নাম অভিনেত্রী মৌসুমী সাহা। যার জীবন যেন সত্যিই এক সিনেমার গল্প।

ছোট পর্দা হোক কিংবা বড় পর্দা, বাংলা বিনোদন জগতের অত্যন্ত পরিচিত মুখ মৌসুমী সাহা। ১৯৮৯ সালে পরিচালক তরুণ মজুমদার-এর ছবি ‘আপন আমার আপন’ দিয়ে অভিনয়ে হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর। তারপর ধীরে ধীরে থিয়েটার, টেলিভিশন আর সিনেমা মিলিয়ে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের অভিনয় দক্ষতায় দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ‘জন্মভূমি’ ধারাবাহিকে জমিদারের ছোট গিন্নির চরিত্রে অভিনয় করে ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এই অভিনেত্রী। প্রায় ১৪০০ এপিসোডে অভিনয় করে তিনি বাংলা টেলিভিশনের এক অবিচ্ছেদ্য মুখ হয়ে ওঠেন। পরে ‘খোকাবাবু’, ‘গঙ্গারাম’ থেকে শুরু করে একাধিক জনপ্রিয় ধারাবাহিকে নায়ক-নায়িকার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেন মৌসুমী।

তবে অভিনয়ের এই সাফল্যের পেছনে ছিল কঠিন লড়াই। এক রক্ষণশীল পরিবারে বিয়ে হওয়ার পর অভিনেত্রী বৌমাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি তাঁর শাশুড়ি। প্রেম করে বিয়ে করলেও অভিনয় করা নিয়ে সংসারে তৈরি হয়েছিল আপত্তি। এমনও সময় গেছে, যখন শাশুড়িকে না জানিয়ে নাটক করতে বেরিয়ে যেতেন মৌসুমী। কখনও বলতেন বাপের বাড়ি যাচ্ছেন, আবার কখনও মঞ্চে ঘোমটা টেনে অভিনয় করেছেন শুধুমাত্র পরিবারের আপত্তি এড়ানোর জন্য। তবে এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে ছিলেন স্বামী। আর সেই সমর্থনই তাঁকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। পরে যখন ‘জন্মভূমি’ ধারাবাহিক জনপ্রিয় হয় এবং মৌসুমী পুরস্কার পান, তখন ধীরে ধীরে বদলে যায় শাশুড়ির মনও।

ব্যক্তিগত জীবনেও কম কষ্টের মুখোমুখি হননি অভিনেত্রী। একবার সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, তিনি যদি সন্তান ধারণ করেন তাহলে মা কিংবা সন্তান কারও একজনের জীবন বিপদের মুখে পড়তে পারে। সেই কঠিন সত্য মেনে নিয়েই জীবন কাটিয়েছেন মৌসুমী সাহা। তবে মাতৃত্বের অনুভূতি থেকে তিনি বঞ্চিত হননি। পরিচিত এক অবাঙালি শিশুকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছেন তিনি। সেই ছেলের বিয়েও দিয়েছেন নিজের হাতে। আজ সেই পরিবারের সন্তানরাই তাকে ‘দিদা’ বলে ডাকে। অভিনেত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁর সমস্ত সম্পত্তিও সেই ছেলের কাছেই থাকবে।

অভিনয়ের পাশাপাশি সংসার সামলানোর ক্ষেত্রেও তিনি এক অনন্য উদাহরণ। আজও ভোর সাড়ে চারটেয় উঠে রান্না করেন, ঘরের কাজ সামলান, তারপর শুটিংয়ে যান। গাড়ি থাকা সত্ত্বেও সময় বাঁচাতে মেট্রো করে স্টুডিওতে যাতায়াত করেন তিনি। তাঁর কথায়, মানুষের কাছাকাছি থাকলেই বেশি শেখা যায়। সহযাত্রীদের কাছ থেকে নানা অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়া পান, যা তাঁকে সমৃদ্ধ করে। এত জনপ্রিয়তা পেয়েও স্টারডম কখনও তাঁকে বদলে দিতে পারেনি। বরং সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এই অভিনেত্রী।

আরও পড়ুনঃ মেসি এখন নচিকেতা চক্রবর্তীর ভক্ত, গাইছে গানও! অভিনেতার মন্তব্যে সরগরম নেটপাড়া, ভাইরাল পোস্টে ফের চর্চায় ঋত্বিক চক্রবর্তী!

ইন্ডাস্ট্রিতে মৌসুমী সাহাকে নিয়ে একটি মজার গুজবও রয়েছে। বলা হয়, তাঁর হাতে চড় খেলে নাকি অভিনেতারা সুপারস্টার হয়ে যান। অভিনেতা দেব, অঙ্কুশ হাজরা কিংবা ‘খোকাবাবু’ ধারাবাহিকের অভিনেতার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে হাসতে হাসতেই এই গল্প বলেন তিনি। তবে মজার আড়ালেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ সংগ্রাম, অপমান, শারীরিক কষ্ট আর ব্যক্তিগত শূন্যতাকে জয় করেও আজও অভিনয়ের প্রতি একই ভালোবাসা ধরে রেখেছেন মৌসুমী সাহা। তাই তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি আসলে এক সাহসী নারীর প্রতিচ্ছবি, যিনি জীবনের প্রতিটি লড়াইকে নিজের মতো করে জিতে নিয়েছেন।

You cannot copy content of this page