বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে ‘ছোট বউ’ ছবির জনপ্রিয় মুখ দেবিকা মুখোপাধ্যায় (Devika Mukherjee)। এক সময় বড় পর্দায় নিজের অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করলেও, গত কয়েক বছর ধরে তাঁকে আর সেভাবে বিনোদন জগতের পর্দায় দেখা যায় না। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, অভিনয় জগৎ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন অভিনেত্রী। তিনি দাবি করেছেন, শুধুমাত্র অভিনয় নয়, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এবং পারিবারিক পরিস্থিতির কারণেও তাঁকে কাজ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। বহু বছর পর নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এনে তিনি জানিয়েছেন, এই বিষয়গুলি নিয়ে সংবাদমাধ্যমও আগে কখনও তাঁর কাছে প্রশ্ন তোলেনি।
দেবিকার কথায়, ‘ছোট বউ’-এর বিপুল জনপ্রিয়তার পর তিনি যে পরিমাণ কাজ পাওয়ার আশা করেছিলেন, বাস্তবে তা হয়নি। এরই মধ্যে বিয়ের পর তিনি স্বামীর সঙ্গে বিদেশে চলে যান। তবে বিদেশে চলে যাওয়াটাই তাঁর কাজ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, বহু শিল্পীই ব্যক্তিগত কারণে বিদেশে যান বা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকেন, কিন্তু তার জন্য তাঁদের পেশাগত জীবন থেমে যায় না। অথচ দর্শক যখন তাঁকে আবার পর্দায় দেখতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি সেই সুযোগ পাননি। দীর্ঘ সময় অভিনয় জগতের বাইরে থাকার কারণে অনেকেই তাঁর বৈবাহিক জীবন কিংবা সংসার নিয়ে প্রশ্ন করলেও, কাজ না পাওয়ার প্রকৃত কারণ নিয়ে কেউ জানতে চাননি বলেও তাঁর আক্ষেপ।
অভিনেত্রী জানান, ২০১৬ বা ২০১৭ সালের দিকে তাঁর কাছে একটি ধারাবাহিকে অভিনয়ের প্রস্তাব আসে। চরিত্রটি ছিল একটি সংসারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মায়ের, যে গোটা পরিবারকে একসুতোয় বেঁধে রাখে। চরিত্রটি তাঁর এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে, দীর্ঘ বিরতির পর অভিনয়ে ফেরার জন্য তিনি উৎসাহিত হয়েছিলেন। স্টুডিওতে গিয়ে তিনি ধারাবাহিকের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পারিশ্রমিক নিয়েও আলোচনা হয়। সেই সময় তিনি জানতেন না যে ধারাবাহিকে ঘণ্টা হিসেবে পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। তাঁকে স্ক্রিপ্ট দেওয়া হয়, তাঁর অভিনয়ের ভিডিও রেকর্ড করা হয় এবং কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া দেখে তাঁর মনে হয়েছিল যে তাঁরা তাঁর অভিনয়ে সন্তুষ্ট।
এমনকি তাঁকে কয়েকটি শুটিংয়ের তারিখও দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে মাত্র তিনটি দিনে তাঁর কাজ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ফাঁকা দিনগুলিতে তাঁকে আর ডাকা হয়নি। পরে তাঁকে জানানো হয়, ওই গল্পটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে এবং অন্য একটি গল্প নিয়ে কাজ করা হবে। এরপরই অভিনেত্রীর দাবি অনুযায়ী, এক প্রোডাকশন ম্যানেজার তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে জানান যে, তাঁকে বাদ দেওয়ার কারণ তাঁর অভিনয় নয়, বরং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান। দেবিকার অভিযোগ, তিনি বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বলেই তাঁকে ওই ধারাবাহিকে নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, যাঁরা এর নেপথ্যে ছিলেন তাঁদের নাম প্রকাশ করতে তাঁর কোনও ভয় নেই, কারণ তাঁরা ভবিষ্যতেও তাঁকে কাজ দেবেন না বলেই তিনি মনে করেন।
সেই প্রোডাকশন ম্যানেজার তাঁকে কয়েকজনের নামও জানিয়েছিলেন বলে তাঁর দাবি। যদিও অভিনেত্রী স্পষ্ট করেছেন, যাঁদের নাম তিনি শুনেছিলেন তাঁদের কারও সঙ্গেই তাঁর ব্যক্তিগত কোনও সম্পর্ক ছিল না। কোনও অনুষ্ঠানে বা ইভেন্টে পরিচয় হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের সঙ্গে তাঁর কখনও যোগাযোগ ছিল না। এই প্রসঙ্গে তিনি একজন পরিচালকের নামও উল্লেখ করেন, যদিও বহু বছর আগের ঘটনা হওয়ায় সেই নামটি নিয়ে তিনি নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নন। বিদেশে স্বামীর কাজের সূত্রে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে থাকার সময় ভারতীয় নাটক দেখতে গিয়ে তাঁর মনে হতো, তিনি আর কোনওদিন দেশে ফিরে অভিনয় করার সুযোগ পাবেন কি না।
সেই হতাশায় তিনি অনেক সময় কান্নায় ভেঙে পড়তেন বলেও জানিয়েছেন। সাক্ষাৎকারে দেবিকা তাঁর স্বামীর হাসপাতাল পরিচালনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়েও একাধিক দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তাঁর স্বামীর একটি হাসপাতাল ছিল, যেখানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তৎকালীন শাসকদলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের রাখা হয়েছিল। অভিনেত্রীর দাবি, তাঁদের কাজের ধরন ও আর্থিক হিসেব-নিকেশের পদ্ধতি কোনওদিনই তাঁর পছন্দ ছিল না। তবে তাঁর স্বামী তাঁকে এই বিষয়ে মুখ খুলতে নিষেধ করেছিলেন। স্বামীর আশঙ্কা ছিল, প্রতিবাদ করলে হাসপাতালের ক্ষতি হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ “মা গো, বাবা গো, পিসি গো…কোথায় সেই তদন্ত চাওয়ার মুখগুলো?” “কোথায় সেই তাগিদ, টিপ্পনি যে বেঁচে থাকা মানুষ কখন আন্দোলন করবে?” বিচারবিহীন ৪ মাস, আত্মপ্রচারের আকাঙ্ক্ষার দৌড়ে আমরা হারিয়ে ফেললাম মানবিকতা? রাহুলের মৃ’ত্যু নিয়ে আবারও সরব জিতু, একাধিক প্রশ্ন তুলে উগরে দিলেন ক্ষো’ভ?
দেবিকার কথায়, কোনও স্ত্রীই চান না তাঁর স্বামীর ব্যবসা বা কর্মক্ষেত্র ধ্বংস হয়ে যাক, তাই তিনিও দীর্ঘদিন নীরব ছিলেন। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন যে, শাসকদলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রভাবের কারণে তাঁকেও বিনোদন জগতে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই নার্সিংহোম বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে জায়গাটি প্রোমোটারদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেছেন। বহু বছর পর নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এনে দেবিকা যে প্রশ্নগুলি তুলেছেন, তা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে আলোচনা শুরু হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।






