বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘পথের পাঁচালী’ (Pather Panchali) শুধু একটি ছবি নয়, এক আবেগের নাম। সেই ছবির অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র ছিল ইন্দিরা ঠাকুরণ, যাঁর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ‘চুনীবালা দেবী’ (Chunibala Devi)। বহু বছর আগে সত্যজিৎ রায় নিজেই বলেছিলেন, এমন ইন্দিরা ঠাকুরণ আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সেই কারণেই যখন পরিচালক অনীক দত্ত ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির কাহিনি নিয়ে ‘অপরাজিত’ ছবি বানানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় এই চরিত্রটি। জানেন কি, ১৯৫২ সালে শুরু হয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’-র কাজ, মুক্তি পায় ১৯৫৫ সালে। ২০২২ সালে ছবির প্রি-প্রোডাকশন ও মেকিংয়ের ৭০ বছর পূর্ণ হওয়াকে মাথায় রেখেই অনীক দত্ত নতুনভাবে সেই সময়কে বড় পর্দায় তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বছরটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষের সমাপ্তির বছরও। সেই আবহেই তৈরি হয় ‘অপরাজিত’ (Aparajito)।
ছবির প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকেই দর্শকদের আগ্রহ ছিল, অনীক দত্ত কীভাবে ইন্দিরা ঠাকুরণের মতো আইকনিক চরিত্রকে পর্দায় ফিরিয়ে আনলেন। কারণ এই চরিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা সিনেমার আবেগ। অনীক দত্ত নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, “সত্যজিৎ রায়ের ইন্দিরা ঠাকুরণ ছিলেন চুনীবালা দেবী। আমার ছবিতে সেই চরিত্রটা কিন্তু একজন পুরুষকে নারী সাজিয়ে করা হয়েছে।” তাঁর এই বক্তব্য সামনে আসতেই শুরু হয় চর্চা। পরিচালক জানান, চরিত্রটির জন্য তিনি বহুদিন ধরে উপযুক্ত মুখ খুঁজছিলেন। কিন্তু কোনও মহিলার মধ্যেই সেই বিশেষ চেহারা, শরীরী ভাষা বা হাঁটার ধরন খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি বলেন, “বিষয়টা আপ্রাণ মেলাতে চেষ্টা করেছি। অনেক খুঁজেছি। ইন্দিরা ঠাকুরণের ওই চেহারাই মেলাতে পাচ্ছিলাম না কোনও মহিলার মধ্যে।”
অনীক দত্ত আরও জানান, তিনি চরিত্রটিকে খুব স্বাভাবিক ও গ্রামবাংলার বাস্তব পরিবেশের মতো করেই দেখাতে চেয়েছিলেন। তাই কোনও আপস করতে চাননি। তাঁর কথায়, “চেহারার গঠন, হাঁটাচলার ধরন পাইনি। আমি একটা স্বাভাবিক গ্রাম্য ব্যাপার চাইছিলাম।” এই চরিত্রের জন্য তিনি বহু মানুষের সাহায্যও চেয়েছিলেন। এমনকি অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়কে দিয়েও খোঁজ করানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই সময় করোনা পরিস্থিতি চলায় বাইরে গিয়ে কাউকে খুঁজে বের করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পরিচালক জানান, “অনেককে বলেছিলাম খোঁজ দিত। মাধবী মুখোপাধ্যায়কেও বলেছিলাম। তার মধ্যে প্যান্ডেমিক ছিল। ফলে বাইরে গিয়ে খোঁজও করতে পারছিলাম না।” ফলে চরিত্রটি নিয়ে চিন্তা আরও বাড়ছিল।
শেষ পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান করে দেন নাট্যব্যক্তিত্ব দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সূত্রেই এক গ্রামীণ লোকশিল্পীর সন্ধান পান অনীক দত্ত। সেখান থেকেই সামনে আসেন হরবাবু, যিনি পরে ‘অপরাজিত’-এর ইন্দিরা ঠাকুরণ হয়ে ওঠেন। অনীক বলেন, “আমাকে শেষমেশ সাহায্য করলেন দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। গ্রামের ফোক আর্টিস্টের খোঁজ দিলেন। সেখান থেকেই খোঁজ পেলাম হরবাবুর। হরবাবুই হলেন আমার ইন্দিরা ঠাকুরণ।” প্রথমে ফোনেই অডিশন নেওয়া হয়েছিল বলে জানান পরিচালক। পরে হরবাবুর ছেলে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। এরপর শুরু হয় লুক টেস্ট এবং চরিত্রের প্রস্তুতি। পুরো বিষয়টি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে করা হয়েছিল বলেও জানান অনীক।
আরও পড়ুনঃ ‘বরণ’ থেকে ‘নবাব নন্দিনী’, একের পর এক মুখ্য চরিত্রে পর্দা কাঁপানো উপস্থিতি ছিল তাঁর! জি, জলসার মতো মূল ধারার চ্যানেলে এখন আর কেন কেন দেখা যায় না ইন্দ্রানী পালকে? তাকে দেখতে উৎসুক আপনারা?
এই চরিত্রের মেকআপ এবং চেহারার পরিবর্তনের পিছনেও ছিল আলাদা পরিশ্রম। অনীক দত্ত বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন মেকআপ আর্টিস্ট সোমনাথের নাম। তাঁর কথায়, “এখানে মেকআপ আর্টিস্ট সোমনাথের কথা বলতেই হবে। ও-ও খুব খুঁতখুঁতে। দাঁতের সেটিং হল।” শুধু মেকআপ নয়, চরিত্রে পুরোপুরি ঢুকে যাওয়ার জন্য হরবাবুকে কিছুদিন কলকাতার একটি গেস্ট হাউসে রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি অভিনেতা সৈকত ঘোষ ওয়ার্কশপও করান। সব মিলিয়ে ‘অপরাজিত’-এ ইন্দিরা ঠাকুরণ চরিত্রকে বাস্তবের কাছাকাছি আনতে কোনও খামতি রাখেননি পরিচালক। আর সেই কারণেই ছবির নেপথ্যের এই গল্প আজও দর্শকদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি করে রেখেছে।






