বাংলা সিনেমার জগতে নিজের আলাদা ভাষা তৈরি করেছিলেন পরিচালক অনীক দত্ত (Anik Dutta)। ছোটবেলা কেটেছিল গোলপার্ক আর উত্তরবঙ্গের পারিবারিক টি এস্টেটের পরিবেশে। নিঃসঙ্গ সময়ের বড় সঙ্গী ছিল গল্পের বই, কমিকস আর পরে সিনেমা। দেশ বিদেশের অসংখ্য ছবি দেখার পাশাপাশি গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray)-এর কাজ। শুধু তাঁর সিনেমাই নয়, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ইলাস্ট্রেশন আর কার্টুনও অনীকের ভীষণ প্রিয় ছিল। সেই টান থেকেই প্রথম জীবনে বিজ্ঞাপনের জগতে কাজ শুরু করেন তিনি। বিজ্ঞাপনের চিত্রনাট্য লেখা থেকে পরিচালনা, সব কাজই দক্ষতার সঙ্গে সামলাতেন। ছোট কিংবা বড় যে কোনও পণ্যের বিজ্ঞাপন নিজের বুদ্ধি আর হাস্যরস দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে দিতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই গল্প আর মজার মিশেলে তিনি আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন।
তবে বিজ্ঞাপনের সাফল্যে আটকে থাকতে চাননি অনীক। তাঁর লক্ষ্য ছিল বড়পর্দায় এমন গল্প বলা, যেখানে থাকবে বাঙালিয়ানা, ব্যঙ্গ, স্মার্টনেস আর স্পষ্ট বক্তব্য। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছিল ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’। প্রথম ছবিতেই বক্স অফিস এবং দর্শকদের মধ্যে তুমুল সাড়া ফেলেছিলেন তিনি। চিত্রনাট্যের হাস্যরস, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আর সামাজিক বার্তাই হয়ে উঠেছিল তাঁর ছবির প্রধান শক্তি। পরবর্তী সময়েও নিজের কাজের ক্ষেত্রে কোনও আপস করেননি অনীক। রাজনৈতিক চাপ, প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে সমস্যা কিংবা নানা বাধার মুখেও নিজের অবস্থান থেকে সরেননি। তাঁর তৈরি ‘অপরাজিত’ প্রথম দিকে খুব কম প্রেক্ষাগৃহে জায়গা পেলেও তিনি আত্মবিশ্বাস হারাননি। বরং জানতেন, দর্শকই শেষ কথা বলবে। পরে সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে শ্যাম বেনেগাল এবং তরুণ মজুমদারের মতো পরিচালকরাও ছবির প্রশংসা করেছিলেন।
টলিপাড়ার অন্য অনেক নির্মাতার থেকে আলাদা ছিলেন অনীক দত্ত। বাংলা সিনেমা নিয়ে তাঁর বক্তব্যও ছিল স্পষ্ট এবং নির্ভীক। তিনি একবার বলেছিলেন, “কেন বলব পাশে দাঁড়ান বাংলা সিনেমার? ভিক্ষে করতে নেমেছি নাকি? ভাল ছবি হলে মানুষ দেখবে নইলে ছুড়ে ফেলে দেবে! সিম্পল!” এই মন্তব্য নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা হয়েছিল। রাজনৈতিক ভাবনা নিয়েও কখনও লুকোছাপা করেননি তিনি। বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী অনীক বিভিন্ন সময় রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর ‘ভবিষ্যতের ভূত’ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও কম হয়নি। একাধিক সময় হুমকি, চাপ এবং অসুবিধার মুখে পড়তে হলেও নিজের বক্তব্য থেকে পিছিয়ে আসেননি তিনি। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, শিল্পের স্বাধীনতা এবং সত্য কথা বলার জায়গায় কখনও আপস করেননি পরিচালক।
শেষ কয়েক বছরে শারীরিকভাবে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন অনীক দত্ত। দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। শরীর খুব একটা সঙ্গ না দিলেও কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরাননি। তাঁর শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতে’ পুরোটা নিজে পরিচালনা করতে পারেননি। শেষের অংশ সহকারীরাই সামলেছিলেন। তবু ছবির একাধিক অভিনেতার ডাবিং নিজে করে দিয়েছিলেন তিনি। তবে ছবির ক্লাইম্যাক্স বদলাতে হওয়ায় সেই কাজ নিয়ে তাঁর মনে একটা আক্ষেপ থেকে গিয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন ভীষণ খুঁতখুঁতে। হুইস্কি আর চায়ের বিষয়ে তাঁর আলাদা পছন্দ ছিল। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক বা শিল্পীদের কাজ ভাল লাগলে নিজে ফোন করে প্রশংসা করতেন। নিজের শহর কলকাতার প্রতি ছিল গভীর টান। বারবার বলতেন, “পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাই না কেন, কলকাতায় ফিরলে যে আরাম পাই, তার সঙ্গে আর অন্য কিছুর তুলনা নেই।”
আরও পড়ুনঃ শেষ ছবির পর আর বাঁচতে চাননি? রহস্যমৃ’ত্যুর পর অনীক দত্তর ঘর থেকে উদ্ধার আ’ত্মহ’ত্যার চিঠি ঘিরে তোলপাড়! মৃ’ত্যুর আগে কী লিখে গেলেন পরিচালক? আদৌও কি ওনারই হাতের লেখা? তদন্তে তৎপর বিশেষজ্ঞরা!
বুধবার সেই প্রিয় শহর কলকাতাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অনীক দত্ত। আবাসনের নীচে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার হওয়ায় ছড়িয়েছে চাঞ্চল্য। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ছাদ থেকে পড়েই ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় পরিচালকের। যদিও মৃত্যুর নেপথ্যে অন্য কোনও কারণ রয়েছে কি না, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। বাংলা সিনেমায় তাঁর অবদান, স্পষ্ট বক্তব্য এবং আপসহীন মানসিকতা তাঁকে আলাদা জায়গা দিয়েছিল। দর্শকদের একাংশের মতে, তিনি শুধু পরিচালক ছিলেন না, ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠও। তাই তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে শোকের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্নও। শহর কলকাতা হারাল এমন এক নির্মাতাকে, যিনি শেষ দিন পর্যন্ত নিজের মতাদর্শ, শিল্পবোধ এবং প্রতিবাদের ভাষা ধরে রেখেছিলেন।






