“দেখেছেন গার্হস্থ্য হিং’সা বাবার অত্যা’চারে ছোটবেলা থেকেই গুটিয়ে গিয়েছিলেন….প্রচুর সম্পত্তির নেননি কানাকড়িও!” একাকীত্ব, মানসিক অব’সাদ গ্রা’স করেছিল পরিচালক অনীক দত্তকে? তাঁর জীবনের অন্ধ’কার অধ্যায় সামনে আনলেন মামাশ্বশুর

টলিউডের প্রখ্যাত পরিচালক অনীক দত্তের আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। গত বুধবার দুপুরে গড়িয়াহাট-হিন্দুস্তান পার্ক এলাকার একটি বহুতল আবাসনের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন ৬৬ বছরের এই পরিচালক। দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। প্রাথমিক তদন্তে শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন মিলেছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার হয়েছে, যেখানে লেখা ছিল, “মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।” তবে এটি আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা, সেই বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। এই ঘটনার পর থেকেই সামনে আসতে শুরু করেছে পরিচালকের দীর্ঘদিনের মানসিক অবসাদ, ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং শৈশবের গভীর মানসিক আঘাতের নানা দিক।

এই আবহেই সামনে এসেছে অনীক দত্তের মনোবিদ চিকিৎসক ডা. অরিজিৎ বসুর বক্তব্য। তিনি জানান, প্রায় আড়াই থেকে তিন বছর ধরে তাঁর চিকিৎসাধীন ছিলেন পরিচালক। প্রথম যখন অনীক তাঁর কাছে যান, তখন তিনি প্রবল মানসিক চাপে ছিলেন। ঘুমের সমস্যা, হঠাৎ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়া, প্যানিক অ্যাটাক এবং গভীর ডিপ্রেশনের মতো সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসকের কথায়, ধীরে ধীরে কাউন্সেলিং ও ওষুধের মাধ্যমে কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিলেন অনীক। কিন্তু নিয়মিত ওষুধ খাওয়া নিয়ে তাঁর অনীহা ছিল। অনেক সময় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আতঙ্কেও ভুগতেন তিনি। শেষবার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার সময় নতুন একটি ওষুধ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই ওষুধকে ‘টক্সিক’ বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন পরিচালক। এরপর গত ছয় মাস আর চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি তিনি। চিকিৎসকের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মানসিক চাপ ও হতাশা তাঁকে ভিতর থেকে ক্রমশ ভেঙে দিচ্ছিল।

পরিচালকের মৃত্যুর পর সংবাদমাধ্যমের সামনে ভেঙে পড়েন তাঁর মামাশ্বশুর বিপ্রদাসবাবু। থমথমে গলায় তিনি জানান, অনীক তাঁকে “মামা” বলে ডাকতেন এবং দু’জনের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। দেখা হলেই সিনেমা নিয়ে আলোচনা চলত। তিনি বলেন, “ওর ভিতরে অনেক ক্ষোভ জমে ছিল। যে সম্মান পাওয়ার কথা ছিল, সেটা ও পায়নি।” বিপ্রদাসবাবুর দাবি, টলিউডে নিজের প্রাপ্য সম্মান না পাওয়ার আক্ষেপ দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়াতেন অনীক দত্ত। এমনকি তাঁর একটি ছবিও নন্দনে মুক্তি না পাওয়া তাঁকে ভীষণভাবে আঘাত করেছিল। বাইরে থেকে শান্ত স্বভাবের মানুষ মনে হলেও ভিতরে ভিতরে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন বলেই মনে করতেন পরিবারের লোকজন। বিপ্রদাসবাবু আরও জানান, জীবনের শেষ কয়েক বছরে পরিচালককে খুব অশান্ত এবং অস্বস্তিতে থাকতে দেখেছেন তিনি।

তবে অনীক দত্তের জীবনের অন্ধকার শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে, ছোটবেলা থেকেই। বিপ্রদাসবাবুর দাবি, অত্যন্ত প্রতিপত্তিশালী পরিবারে জন্ম হলেও শৈশব মোটেও সুখের ছিল না তাঁর। ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত ছিলেন তাঁর দাদু। পরিবারে অর্থ ও প্রভাবের কোনও অভাব ছিল না। কিন্তু সেই বাড়ির ভিতরেই নাকি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের শিকার হতে হয়েছিল অনীককে। অভিযোগ, তাঁর বাবার সঙ্গে সম্পর্ক কোনওদিনই স্বাভাবিক ছিল না। ছোটবেলায় বাবার মারধর এবং কঠোর ব্যবহার তাঁকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। খুব কম কথা বলতেন, হাসিখুশি থাকতে পারতেন না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। যদিও মায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর, কিন্তু বাবাকে কোনওদিন মেনে নিতে পারেননি তিনি।

আরও পড়ুনঃ হাসিমুখ, ভাইরাল ভিডিয়ো, লাখো ভিউস…ভিতরে কি ততদিনে শেষ হয়ে যাচ্ছিলেন সায়নী চক্রবর্তী? লাখো মানুষকে হাসাতেন, কা’ন্নাটা কেউ বুঝল না? আ’ত্মঘা’তী হওয়ার ভাবনা তো একদিনে আসে না, কনটেন্ট ক্রিয়েটরের রহস্যমৃ’ত্যুতে সোশ্যাল মিডিয়ার ‘সুখী মুখোশ’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নেটিজেনরা!

সূত্রানুসারে, বছরের পর বছর জমে থাকা সেই মানসিক ক্ষোভ একসময় বিস্ফোরণের রূপ নেয়। একদিন আচমকাই বাড়ির সমস্ত জানলার কাঁচ রড দিয়ে ভেঙে ফেলেন অনীক। এমনকি বাবার মার্সিডিজ গাড়িও ভাঙচুর করেছিলেন বলে জানা যায়। সেই ঘটনার পর থেকেই পরিবারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব আরও বাড়ে। পরে বাবার বিপুল সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও কোনওদিন সেই সম্পত্তির ভাগ দাবি করেননি তিনি। বরং নিজের আত্মসম্মানকে বড় করে দেখেছিলেন। কাছের মানুষদের মতে, এই অভিমান, শৈশবের মানসিক আঘাত, দীর্ঘদিনের অবসাদ এবং কাজের জগতে প্রাপ্য সম্মান না পাওয়ার কষ্ট সব মিলিয়ে ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়ছিলেন অনীক দত্ত। তাঁর মৃত্যু তাই শুধু এক পরিচালকের প্রয়াণ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করা এক মানুষের নীরব ভেঙে পড়ার গল্পও হয়ে উঠছে।

You cannot copy content of this page