“রাজনীতি তার জায়গায়, মনুষ্যত্ব সবার আগে” অনীক দত্তের শেষযাত্রায় রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভাজন ভুলে একসঙ্গে রূপা গঙ্গোপাধ্যায় ও শতরূপ ঘোষ! পশ্চিমবঙ্গে কি ফিরছে হারিয়ে যাওয়া সৌজন্য ও সহমর্মিতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি?

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় পরিচালক অনীক দত্তের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে টলিউডে। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, ‘অপরাজিত’-এর মতো একাধিক প্রশংসিত ছবি উপহার দেওয়া এই নির্মাতা দীর্ঘদিন ধরেই নিজের স্বতন্ত্র চিন্তাভাবনা ও সাহসী চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু শুধু চলচ্চিত্র জগতেরই নয়, বাংলা সংস্কৃতিরও এক অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করছেন অনেকে। প্রিয় পরিচালকের শেষযাত্রায় দেখা গেছে অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক, কলাকুশলী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের বহু পরিচিত মুখকে। নন্দন থেকে এনটিওয়ান স্টুডিয়ো পর্যন্ত শেষবারের মতো অনীক দত্তকে শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নেমেছিল।

পরিচালকের শেষকৃত্য ও অন্তিম শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের অনুষ্ঠানে দেখা গেল এক বিরল ছবি। রাজনৈতিক মতাদর্শে সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর দুই পরিচিত মুখ বিজেপি নেত্রী ও অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ একসঙ্গে উপস্থিত হলেন অনীক দত্তকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। বর্তমান সময়ে যখন রাজনৈতিক বিভাজন প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্পষ্ট, তখন অনীক দত্তের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা যেন সমস্ত মতভেদকে এক মুহূর্তে দূরে সরিয়ে দিল। স্টুডিয়োপাড়ায় উপস্থিত বহু মানুষের কাছেই এই দৃশ্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সেখানে রাজনীতি নয়, প্রাধান্য পেয়েছিল একজন শিল্পীর প্রতি সম্মান এবং একজন বন্ধুকে হারানোর বেদনা।

প্রিয় বন্ধুর বিদায়বেলায় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি জানান, “যেদিন ওর সবকিছু ভালো পাওয়ার সময় এল, আর ক’টা দিন আমাকে একটু সময় দিল না। আমি তো ওকে বলারও সুযোগ পেলাম না, এবার মন খুলে সিনেমা বানাও।” রূপা জানান, রাজনৈতিক মতাদর্শে পার্থক্য থাকলেও অনীক দত্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। সেই কারণেই তিনি সাদা রজনীগন্ধার পাশাপাশি একটি লাল গোলাপও নিয়ে এসেছিলেন। রূপার কথায়, “ও সারাজীবন সিপিএমের ভক্ত ছিল। তাই আমি ওকে আজ লাল গোলাপ দিয়েছি। আমার মনে হয় অনীক দত্ত পশ্চিমবঙ্গের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির রাজনৈতিক অরাজকতার এক নিখুঁত উদাহরণ।” অন্যদিকে শতরূপ ঘোষও স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, অনীক দত্ত নিজের বিশ্বাস ও নীতিতে অটল ছিলেন এবং কোনও চাপের কাছে কখনও মাথা নত করেননি।

তবে এই শেষযাত্রার সবচেয়ে বড় বার্তা ছিল রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার জয়। সোশ্যাল মিডিয়াতেও সেই ছবি দেখে বহু মানুষ আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ লিখেছেন, “খারাপ খবরের দিনেও একটা মন ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্ত, রাজনীতি তার জায়গায় থাক না, মনুষ্যত্ব বেঁচে থাক।” আবার আরেকজনের মন্তব্য, “গত পনেরো বছর তো এই সৌজন্যটাই হারিয়ে গিয়েছিল, আমরা-তোমরা করে। আবার ফিরুক সেই মানবিকতা। দিন শেষে আমরা সবাই মানুষ, এখানে বিজেপি-সিপিএম বলে কিছু নেই।” রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে এমন মন্তব্যগুলি যেন নতুন করে মানুষের মধ্যে সৌজন্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

আরও পড়ুনঃ অনীক দত্তর শেষযাত্রাও বিতর্কিত! যাঁর ছবিতে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা, তাঁকে শেষ শ্রদ্ধাও জানালেন না পরমব্রত, স্বস্তিকা, সায়নী ও মীর! “ব্যাপারটা শুধুই ‘আমরা-ওরা’ নয়, ওই নিষ্প্রাণ মেরুদন্ডের মুখোমুখি হতে ভয়!” “শিরদাঁড়া বিহীন মনুষ্য রূপী প্রানী” ক্ষুব্ধ নেটপাড়ার কটাক্ষ!

অনীক দত্তের প্রয়াণের দিনে তাই শুধু একজন পরিচালকের বিদায় নয়, বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এল। রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হতেই পারে, বিরোধিতা থাকতেই পারে, কিন্তু তার ঊর্ধ্বে থাকে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব এবং সম্মান। “এটাই দরকার। রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষ, দিদি বা বন্ধুত্ব অনেক উঁচু মানের” এমন মন্তব্যও উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অনেকেই মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে এমন সৌজন্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রয়োজন, যেখানে রাজনীতি হবে তার নিজের জায়গায়, সমালোচনা হবে যুক্তির ভিত্তিতে, ভালো কাজের প্রশংসাও হবে খোলাখুলি, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকবে। অনীক দত্তের শেষযাত্রা যেন সেই মানবিকতারই এক আবেগঘন স্মারক হয়ে রইল।

You cannot copy content of this page