টলিপাড়ার অন্দরে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলল। বহু বছর ধরে বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের কর্মপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসা ফেডারেশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন নানা আলোচনা চলছিল, ঠিক সেই সময় টেকনিশিয়ান স্টুডিও প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সভা থেকে যুগান্তকারী ঘোষণা করলেন টালিগঞ্জের নবনির্বাচিত বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী। তিনি জানান, পুরনো কাঠামোর পরিবর্তে এবার নতুন কনফেডারেশনের অধীনে শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী পরশু থেকেই বিভিন্ন গিল্ডকে একত্রিত করার কাজ শুরু হবে। বাংলা বিনোদন জগতকে আরও সুসংগঠিত, স্বচ্ছ এবং কর্মমুখী করে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। সভায় উপস্থিত শিল্পী, কলাকুশলী ও কর্মীদের সামনে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন যে শিল্পের স্বার্থেই এই পরিবর্তন প্রয়োজন।
সভামঞ্চ থেকেই পাপিয়া অধিকারী জানান, একটি শুটিং ইউনিটে কতজন কর্মী প্রয়োজন হবে, সেই সিদ্ধান্ত একমাত্র প্রযোজক এবং এক্সিকিউটিভ প্রযোজকরাই নেবেন। এই বিষয়ে অন্য কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের হস্তক্ষেপ তিনি আর দেখতে চান না। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পের ভেতরে তৈরি হওয়া নানা ধরনের চাপ, বিধিনিষেধ এবং অপ্রয়োজনীয় নিয়মের দিকেও ইঙ্গিত করেন তিনি। একই সঙ্গে পরিচালকদের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, একসময় পরিচালকরা অভিভাবকের মতো সম্মান পেতেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে গিয়েছে। তাঁর মতে, ছবির প্রকৃত “ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ” হলেন পরিচালক। তাই এবার থেকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব এবং গ্রহণযোগ্যতা তাঁদের হাতেই তুলে দিতে হবে। সহকারী পরিচালকদের কাজ হবে পরিচালকের ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সাহায্য করা।
শুধু পরিচালক নন, বিভিন্ন কারিগরি বিভাগের দায়িত্ব নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন পাপিয়া। তাঁর মতে, ক্যামেরা বিভাগের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো কী হবে, তা সংশ্লিষ্ট বিভাগই ঠিক করবে। একইভাবে ইলেকট্রিশিয়ান, ট্রলি এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট বিভাগের মধ্যেই থাকা উচিত। স্টুডিওর বাইরে শুটিংয়ের ক্ষেত্রেও অপ্রাসঙ্গিক নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। কোথায় কোন পরিকাঠামো প্রয়োজন, তা বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করেই নির্ধারণ করা উচিত বলে মত তাঁর। পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করে দেন, এই উদ্যোগের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক সমীকরণ জড়িত নয়। কে কাকে ভোট দেবেন, তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় বলেই উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, এই লড়াই শুধুমাত্র শিল্পের স্বার্থে।
এদিন সবচেয়ে বড় ঘোষণাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ফেডারেশনের ২৬টি গিল্ডের বর্তমান কাঠামো নিয়ে মন্তব্য। পাপিয়া অধিকারী জানান, এতদিনের সেই কাঠামো আর বজায় থাকবে না। পরিবর্তে পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার, প্রোডাকশন ম্যানেজার এবং কস্টিউম বিভাগের মতো কয়েকটি মূল গিল্ডকে কেন্দ্র করেই নতুন কর্মপদ্ধতি তৈরি হবে। এই বিভাগগুলির সঙ্গে সমন্বয় রেখে শিল্পী ও কলাকুশলীদের কাজের সুযোগ তৈরি করা হবে। ফলে কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং সমন্বয়ের ভিত্তিতেই কাজের পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গিল্ড নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনাই এখন প্রধান লক্ষ্য। শিল্পে দক্ষতা এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতেই কাজের সুযোগ তৈরি করার কথা বলা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ পালাবদলের রাজনীতিতে উধাও চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলা ভিভান, সদা দিদির পাশে ঘোরা লাভলি, সায়ন্তিকা, সৌমিতৃষা, জুন, সোহেল, অদিতি মুন্সিরা! দিদির অসময়ে রয়ে গেলেন দিদি ভক্ত একনিষ্ঠ এই তিন তারকা
ম্যানেজার এবং প্রোডাকশন কন্ট্রোলারদের ভূমিকাও এদিন বিশেষভাবে উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। পাপিয়া অধিকারীর দাবি, এই ক্ষেত্রগুলিতে দায়িত্বের পাশাপাশি নানা অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগও সামনে এসেছে। বিশেষ করে টাকা দিয়ে কাজ পাওয়ার অভিযোগ কিংবা অযোগ্য ব্যক্তিদের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি। তবে আপাতত কাউকে আইনি জটিলতায় জড়ানোর পথে হাঁটতে চান না বলেও স্পষ্ট করেন। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। তাঁর কথায়, “শর্ত নয় প্রত্যাশা, ভয় নয় ভরসা” এই ভাবনাকেই সামনে রেখে নতুন কনফেডারেশনের পথচলা শুরু হবে। এখন টলিপাড়ায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই নতুন উদ্যোগ কি সত্যিই শিল্পের নতুন দিশা দেখাবে, নাকি আবারও নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে।






