টালিগঞ্জ থেকে নিউ আলিপুর, গত কয়েকদিন ধরে একাধিক অভিযোগকে কেন্দ্র করে তোলপাড় রাজনৈতিক ও বিনোদন মহল। সেই আবহেই বড় পদক্ষেপ করল আলিপুর আদালত। তৃণমূলের পরিচিত নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাসকে আগামী ১৮ জুন পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ তাঁকে আলিপুর আদালতে তোলা হয়। তার আগের রাতেই নিউ আলিপুর থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। তদন্তকারীদের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশের পর এখন তদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকেই দুর্নীতি ও তোলাবাজির অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনের সক্রিয়তা বেড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে স্বরূপ বিশ্বাসের নাম সামনে আসায় বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, নিউ আলিপুর ও টালিগঞ্জ এলাকার একাধিক নির্মাণ ব্যবসায়ী এবং প্রোমোটার দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, হুমকি এবং জোর করে টাকা আদায়ের অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, এলাকায় নতুন আবাসন, বহুতল বা ফ্ল্যাট প্রকল্প শুরু করতে গেলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হতো।
কেউ সেই দাবি না মানলে নির্মাণকাজে বাধা দেওয়া বা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এই অভিযোগগুলিই তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, সম্প্রতি একটি নির্মাণ সংস্থা সরাসরি কোটি টাকার তোলা দাবি এবং ভয় দেখানোর অভিযোগ তুলে এফআইআর দায়ের করে। এরপরই তদন্তের গতি বাড়ায় নিউ আলিপুর থানার পুলিশ। তদন্তে বেশ কিছু তথ্য সামনে আসার পর বৃহস্পতিবার স্বরূপ বিশ্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাত প্রায় ১০টা নাগাদ তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, সিমরন পাল নামে এক অভিযোগকারীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ৪ জুন ২০২৬ নিউ আলিপুর থানায় মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় একাধিক ধারার পাশাপাশি অস্ত্র আইনের ২৫ ও ২৭ ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। ফলে তোলাবাজির পাশাপাশি অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। শুধু আর্থিক অনিয়ম বা তোলাবাজির অভিযোগই নয়, স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগও সামনে এসেছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। তদন্তকারীরা অভিযোগের প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখছেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বয়ান সংগ্রহ করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে টালিগঞ্জ ও নিউ আলিপুর এলাকায় স্বরূপ বিশ্বাসকে অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ওই অঞ্চলে তাঁর প্রভাব ছিল যথেষ্ট শক্তিশালী। সেই কারণেই তাঁর গ্রেফতারি শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকের মতে, এই ঘটনা আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিতে পারে। স্বরূপ বিশ্বাসের দাদা অরূপ বিশ্বাস দীর্ঘদিন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন এবং শাসক শিবিরের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবেও পরিচিত। ফলে এই গ্রেফতারিকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ স্বরূপ-সোহমের পর এবার আইনের গেরোয় মিমি চক্রবর্তী! টলিউডের গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত! অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে কী নিয়ে আদালতে জমা পড়ল চার্জশিট?
বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, “একে একে সব তোলাবাজ ও দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তাদের মতে, এই ঘটনা অতীতের সিন্ডিকেট ও তোলাবাজি সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত স্বরূপ বিশ্বাস, অরূপ বিশ্বাস বা তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এদিকে তদন্তকারীরা আদালতের কাছে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিলেন। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই ১৮ জুন পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয় আদালত।






