“তানপুরার সুর মেলাতেই শরীরের ভেতরে যেন বিদ্যুৎ মত কিছু একটা হয়ে গেল” আশীর্বাদ না থাকলে গলায় ‘সা’ আসবে না! সংগীত সাধনায় কোন গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কথা জানালেন হৈমন্তী শুক্লা?

সংগীত শুধু রেওয়াজ, কৌশল বা প্রতিভার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতি। বহু শিল্পীর বিশ্বাস, যতই সাধনা করা হোক না কেন, ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছাড়া প্রকৃত শিল্পসাধনা পূর্ণতা পায় না। একজন শিল্পী যত বড়ই হোন, তাঁর সাফল্যের পেছনে থাকে অদৃশ্য এক শক্তির কৃপা। সেই কারণেই অনেক গুণী শিল্পী বারবার বলেছেন, সুরের জগতে বিনয় ও আত্মসমর্পণের কোনও বিকল্প নেই। সম্প্রতি এমনই এক গভীর উপলব্ধির কথা শোনালেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত ও আধুনিক গানের শিল্পী হৈমন্তী শুক্লা।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলা সংগীত জগতের পরিচিত নাম হৈমন্তী শুক্লা। অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। সংগীতের পাশাপাশি নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে কথা বলতে শোনা যায় তাঁকে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সংগীতসাধনার এমন কিছু দিক নিয়ে কথা বলেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো খুব একটা পরিচিত নয়। তিনি জানান, গান গাইতে গিয়েই বহুবার এমন কিছু অনুভূতির মুখোমুখি হয়েছেন, যার ব্যাখ্যা তিনি নিজেও পুরোপুরি দিতে পারেন না।

হৈমন্তী শুক্লা বলেন, কখনও কখনও তানপুরার সঙ্গে সুর মিলিয়ে গান গাওয়ার সময় তাঁর মনে হয়েছে যেন শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুতের মতো কিছু একটা বয়ে গেল। হঠাৎ করেই তিনি চমকে উঠেছেন। এই অনুভূতি অন্য সময়ে হয় না, শুধুমাত্র গান গাওয়ার সময়ই হয়। তাঁর কথায়, অনেকক্ষণ গান গাওয়ার পর হঠাৎ এমন অভিজ্ঞতা আসে। আবার এমনও দিন যায়, যখন গানের আসরে বসে মনে হয় ‘সা’ সুরটাই ঠিকমতো ধরা যাচ্ছে না। একজন শিল্পীর কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ সমস্ত সংগীতের ভিত্তিই হল ‘সা’।

এই প্রসঙ্গে তিনি প্রখ্যাত সরোদবাদক আলি আকবর খানের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেন। হৈমন্তী শুক্লার মতে, আলি আকবর খান বারবার বলতেন, শুধু যন্ত্র বাজানো বা গলা সাধলেই হয় না। উপরওয়ালার আশীর্বাদ না থাকলে ‘সা’ কখনও প্রকৃত অর্থে সুরে বসবে না। তাঁর বিশ্বাস, ‘সা’ বলা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই কঠিন। সেই নিখুঁত সুরে পৌঁছতে গেলে শিল্পীকে এক ধরনের ঈশ্বরকৃপা লাভ করতে হয়। তিনি মনে করেন, সংগীত এমন এক সাধনা, যেখানে মানুষের দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন আত্মিক শক্তি ও বিনয়।

আরও পড়ুনঃ এবার দল বদলুর তালিকা তে তিনি‌ও? লাগাতার কটা’ক্ষের মুখে আজই রাজ্যসভার সদস্যপদ ছাড়ছেন কোয়েল ও সুখেন্দু? বিরাট গুঞ্জন বঙ্গ তৃণমূলে

হৈমন্তী শুক্লার এই বক্তব্যের মধ্যে শুধু সংগীতচর্চার কথা নয়, জীবনের একটি বড় দর্শনও লুকিয়ে রয়েছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, শিল্পের জগতে অহংকারের কোনও স্থান নেই। যত বড় শিল্পীই হোন না কেন, সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে এক অদৃশ্য শক্তি, যার আশীর্বাদ ছাড়া প্রকৃত শিল্পসাধনা সম্ভব নয়। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, সংগীতের গভীরতা কেবল রেওয়াজ বা প্রযুক্তিগত দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং শিল্পীর আত্মসমর্পণ, বিশ্বাস এবং অন্তরের পবিত্রতার সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর এই উপলব্ধি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছেও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠতে পারে।

You cannot copy content of this page