শেষবার মহানায়ককে দেখতে এসেছিলেন প্রিয় রমা! স্বামীর ম’রদেহের সামনে দাঁড়িয়েই সুচিত্রা সেনকে কী দায়িত্ব দিয়েছিলেন সদ্য বিধবা গৌরী দেবী? মহানায়িকাকে দিয়ে সেদিন যা করিয়েছিলেন উত্তম পত্নী, সেই মুহূর্ত ঘিরে আজও হয় চর্চা! জানলে, আবেগে ভাসবেন আপনিও!

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন এমন একটি জুটি, যাঁদের জনপ্রিয়তা সময়ের সীমানা পেরিয়েও আজও অটুট। একসঙ্গে ২৯টি ছবিতে অভিনয় করে তাঁরা তৈরি করেছিলেন এক অনন্য রোম্যান্টিক জুটি, যা এখনও দর্শকের কাছে সমান প্রিয়। উত্তম কুমারকে আজও মহানায়ক এবং সুচিত্রা সেনকে মহানায়িকা হিসেবেই মনে রাখেন বাঙালি। তাঁদের অনস্ক্রিন রসায়ন নিয়ে বহু আলোচনা হলেও, বাস্তব জীবনে এই সম্পর্ককে কীভাবে দেখতেন উত্তম কুমারের স্ত্রী গৌরী দেবী, তা নিয়ে মানুষের কৌতূহল বরাবরই ছিল। সম্প্রতি মহানায়কের নাতনি নবমিতার একটি সাক্ষাৎকার সেই অজানা অধ্যায়ের কথাই নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে এমন একটি ঘটনা, যা আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আবেগাপ্লুত করে।

উত্তম কুমারের সাফল্যের পেছনে তাঁর পরিবারের সমর্থন ছিল সবসময়। গৌরী দেবী জানতেন, পর্দায় সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর স্বামীর জুটি দর্শকের কাছে কতটা প্রিয়। তাই এই জুটির জনপ্রিয়তা নিয়ে তাঁর কোনও আপত্তি ছিল না। বরং সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। উত্তম কুমারের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো থেকে শুরু করে বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন সুচিত্রা। এমনকি উত্তম ও গৌরীর ছেলে গৌতমের বিয়েতেও তাঁকে দেখা গিয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে গৌরী দেবী ও সুচিত্রা সেনের আন্তরিকতা উপস্থিত সকলের নজর কেড়েছিল। পারিবারিক সম্পর্কের এই উষ্ণতাই পরবর্তীকালে আরও এক আবেগঘন ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকে।

মহানায়কের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ বাড়ির ঠাকুরঘরের সামনে রাখা হয়েছিল, যাতে প্রিয় মানুষ এবং অনুরাগীরা শেষবারের মতো তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। নবমিতার কথায় জানা যায়, গভীর রাতে মহানায়ককে শেষবার দেখতে বাড়িতে আসেন সুচিত্রা সেন। খুব কাছের মানুষরা তাঁকে ‘রমা’ নামেই ডাকতেন, আর উত্তম কুমারও সেই নামেই সম্বোধন করতেন। সেদিন সুচিত্রা একটি সাদা মালা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁকে দেখেই গৌরী দেবী কাছে ডাকেন এবং একটি বিশেষ ইচ্ছার কথা জানান। সেই মুহূর্তের ঘটনাই আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য স্মৃতি হয়ে রয়েছে।

গৌরী দেবীর ইচ্ছা ছিল, উত্তম কুমারের মরদেহে প্রথম মালাটি পরাবেন সুচিত্রা সেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পর্দার জীবনে যিনি সবচেয়ে বেশি বার উত্তম কুমারের গলায় মালা পরিয়েছেন, শেষ বিদায়ের সময়ও সেই সম্মান তাঁরই প্রাপ্য। তাই পরিবারের কেউ নয়, চট্টোপাধ্যায় পরিবারের কোনও সদস্যও সুচিত্রার আগে মহানায়কের মরদেহে মালা পরাননি। গৌরী দেবীর এই সিদ্ধান্ত উপস্থিত সকলকে আবেগপ্রবণ করে তুলেছিল। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, স্বামীর জনপ্রিয় অনস্ক্রিন জুটিকে তিনি কখনও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেননি, বরং যথাযোগ্য সম্মানই দিয়েছিলেন।

উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের জুটি শুধু সিনেমার পর্দাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্কও বহু মানুষের কাছে উদাহরণ হয়ে রয়েছে। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে এই জুটিকে ঘিরে যত আলোচনা হয়েছে, ততটাই আলোচিত ছিল তাঁদের ব্যক্তিগত সৌজন্য এবং সম্পর্কের উষ্ণতা। গৌরী দেবীর আচরণও সেই সৌজন্যেরই এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে আজও স্মরণ করা হয়। তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা জানার পর অনেকেই মনে করেন, একজন মানুষের ব্যক্তিগত উদারতা কতটা বড় হতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ এটি।

আরও পড়ুনঃ ‘এই যুগের উত্তম কুমার’ বলেই তাঁকে ডাকতেন দর্শক! স্ত্রী ও দুই ছেলেকে রেখে, মাত্র ৪৪ বছরেই চিরবিদায় সুপুরুষ নায়কের! বাংলা টেলিভিশনের হার্টথ্রব, কুনাল মিত্রের অকাল মৃ’ত্যু আজও নাড়া দেয় অনুরাগীদের! একটা ভুল সিদ্ধান্ত কেড়ে নিয়েছিল সব, একটু সংযম করলেই কি আজও বেঁচে থাকতেন প্রিয় অভিনেতা?

স্বামীকে হারানোর ধাক্কা গৌরী দেবী কোনওদিনই কাটিয়ে উঠতে পারেননি। উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের কথায়, সেই শোক তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। মহানায়কের প্রয়াণের প্রায় এক বছরের মধ্যেই গৌরী দেবীরও মৃত্যু হয়। তবে তাঁর জীবনের সেই মানবিক সিদ্ধান্ত এবং সুচিত্রা সেনকে দেওয়া সম্মান আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। উত্তম, সুচিত্রা এবং গৌরী দেবীর এই সম্পর্কের গল্প আজও নতুন প্রজন্মের কাছে সমানভাবে আলোচিত এবং আবেগের।

You cannot copy content of this page