‘সেদিন অপমানে চোখে জল এসেছিল…কাজ করতে দেওয়া তো দূরের কথা, আমার সঙ্গে আরও অনেক অন্যায় হয়েছে’ এত বঞ্চনা সহ্য করেও কেন মমতার ডাকে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে গেলেন সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়? সমালোচনার মুখে কী বললেন অভিনেত্রী-আবৃত্তিকার?

বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের পরিচিত নাম ‘সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়’ (Sutapa Bandhopadhayay)। দীর্ঘদিন দূরদর্শন কলকাতার সংবাদ পাঠিকা হিসেবে তিনি দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। পরে আবৃত্তি, মঞ্চ সঞ্চালনা এবং অভিনয়ের ক্ষেত্রেও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর কণ্ঠে কবিতা পাঠ বহু মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। জনপ্রিয় বেশকিছু ধারাবাহিকেও তাঁকে দেখা গিয়েছে। সংবাদ পাঠিকা থেকে আবৃত্তিকার এবং অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা তাঁকে বাংলা সংস্কৃতি জগতের এক পরিচিত মুখে পরিণত করেছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহে তাঁকে ঘিরে ওঠা বিতর্কের প্রসঙ্গে খোলাখুলি মত প্রকাশ করেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করা হয়, রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদলের পর যখন অনেক শিল্পীকে নিয়ে নানান আলোচনা চলছে এবং অনেকেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন বলে অভিযোগ উঠছে, তখন তিনি কেন রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন? এর উত্তরে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমি একজন শিল্পী। শিল্প কখনও রাজনীতি দেখে না, আর রাজনীতি বিষয়টা আমি বুঝিও না। সংসারের রাজনীতিও বুঝি না, রাজ্যের রাজনীতিও বুঝি না। একজন শিল্পী হিসেবেই সেখানে গিয়েছি শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা পাঠ করতে।

কেউ যদি আমায় যোগ্য মনে করে ডাকে, তাহলে যেতে তো বাধা নেই! আগের সরকারের আমলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গেছি, বর্তমান সরকারের আমলেও যাব। তফাৎটা এখানেই, যদি রাজনীতি করার হত তাহলে ক্ষমতা হারানোর পর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ডাকে যেতাম না।” একই বক্তব্যে তিনি আরও জানান, “এমন নয় যে ওনার সাথে আমার কোনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে বা খুব ভালো সম্পর্ক। আমিও অনেক কিছুর শিকার হয়েছি। তৎকালীন সাংস্কৃতিক মন্ত্রী যিনি ছিলেন, কয়েক বছর রবীন্দ্রজয়ন্তীতে কবিতা পাঠের অংশ থাকলেও, তারপর সেটা তুলে দেন। এমনও দেখেছি যে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে আধুনিক গানের শিল্পীরা উপস্থিত কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এত কবিতা থাকা সত্ত্বেও আবৃত্তিকারদের জায়গা নেই।”

সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এমনকি একুশে ফেব্রুয়ারীর মঞ্চে আমাকে ডাকা হয়েছিল বাকি অনেক শিল্পীদের মতোই। সবাইকে যখন মঞ্চে উঠতে বলা হলো, আমি উঠতে গেলেই বাধা দেওয়া হয়। সেইদিন চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গেছিল। পরে কারণ জানতে পেরেছিলাম, আমার স্বামী সামাজিক মাধ্যমে তাদের দল বিরোধী কোনও কথা লিখেছেন তাই।” শুধু তাই নয়, তিনি দাবি করেন, “এমন কি আরজিকর কাণ্ডের সময় পথে নামার কারণে প্রায় দেড় বছর আমায় কোনও কাজ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি একটি মেলায় অনুষ্ঠানের সবকিছু ঠিক হয়ে যাওয়ার পরেও, আগের রাতে ফোন করে জানানো হয় সেটি বাতিল হয়েছে।”

আরও পড়ুনঃ “স্বামীর পদবী আমার পরিচয় নয়, আমি কোনদিন স্বামীর পদবীর নি‌ইনি” ২৮ বছরের দাম্পত্য জীবনের আড়ালে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে কোন অজানা সত্যি প্রকাশ করলেন অপরাজিতা আঢ্য?

তবে এতকিছুর পরেও শিল্পকেই নিজের প্রধান পরিচয় হিসেবে দেখতে চান তিনি। সাক্ষাৎকারের শেষ অংশে তিনি বলেন, “কাজেই এত কিছু সহ্য করে আমিও তো মুখ খুলতে পারতাম, কিন্তু শিল্পকে এগিয়ে রাখতে চেয়েছি। শিল্পী হিসেবে সেখানে গেছি, তাই কোনও রকম ভুল করেছি এটা মনে হয় না। আমার বিশ্বাস, আমার মতো বাকি শিল্পীরাও অতীতের মতো বর্তমান সরকারের ডাকেও যাবে শুধুমাত্র শিল্পের টানে।” তাঁর এই বক্তব্যকে ঘিরে ইতিমধ্যেই সাংস্কৃতিক মহলে নানান প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তবে সুতপার অবস্থান স্পষ্ট, রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে তিনি নিজেকে একজন শিল্পী হিসেবেই দেখতে চান এবং সেই পরিচয় নিয়েই কাজ করে যেতে চান।

 

View this post on Instagram

 

You cannot copy content of this page