বাংলা চলচ্চিত্র, নাটক এবং নৃত্যজগতের অন্যতম বিশিষ্ট নাম মমতা শঙ্কর। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অভিনয়, নৃত্য এবং সংস্কৃতির জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন তিনি। শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, সমাজ ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্যও বারবার আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নারী স্বাধীনতা, বর্তমান সমাজের পরিবর্তন, শিক্ষা, ধর্ম, সামাজিক মূল্যবোধ এবং নতুন প্রজন্মের জীবনযাপন নিয়ে খোলামেলা মত প্রকাশ করেন মমতা শঙ্কর। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল উদ্বেগ, তেমনই ছিল সমাজকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
নারী স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মমতা শঙ্কর বলেন, এখনও সমাজে এমন অনেক নারী আছেন যারা নানা বাধা ও চাপে বন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হন। তবে একইসঙ্গে তিনি মনে করেন স্বাধীনতার অর্থ কখনও ইচ্ছেমতো সবকিছু করা নয়। তাঁর বক্তব্য, কিছু ক্ষেত্রে স্বাধীনতার ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “যা ইচ্ছে তাই করব, সেটাই স্বাধীনতা নয়।” সমাজে অনেক নারী আজ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছেন, নিজের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু স্বাধীনতার নামে যদি দায়িত্ববোধ হারিয়ে যায় বা এমন কিছু করা হয় যা সমাজের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়, তাহলে তা প্রকৃত স্বাধীনতা নয় বলেই মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, যাঁরা এখনও নানা সামাজিক বাধার মধ্যে রয়েছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হওয়া উচিত প্রকৃত স্বাধীনতার লক্ষ্য।
সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী। তিনি জানান, সম্প্রতি একটি ভিডিও দেখে তিনি বিস্মিত ও হতাশ হয়েছিলেন। একটি তরুণীর আচরণ ও নাচের ধরন তাঁর কাছে অত্যন্ত অস্বস্তিকর বলে মনে হয়েছে। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সমাজ কোন দিকে এগোচ্ছে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, এই মন্তব্য সব নারীর ক্ষেত্রে নয়। তাঁর মতে, অধিকাংশ নারীই অত্যন্ত সচেতন ও দায়িত্বশীল। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা সামনে আসার ফলে স্বাধীনতা ও আধুনিকতার ধারণা নিয়ে ভুল বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি মনে করেন, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বোঝানো এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
শিক্ষা ও ধর্ম নিয়ে মমতা শঙ্করের বক্তব্যও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করলেই প্রকৃত শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একজন ভালো মানুষ তৈরি করা। শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া বা উচ্চশিক্ষা অর্জন করাই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। একইভাবে ধর্ম নিয়েও তিনি বলেন, কোনো ধর্মই মানুষকে ঘৃণা, হিংসা বা বিভেদের শিক্ষা দেয় না। সব ধর্মই মানুষকে ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার শিক্ষা দেয়। বিশেষ করে সনাতন ধর্ম সম্পর্কে নানা ভুল ব্যাখ্যার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই ধর্মের মূল দর্শন অত্যন্ত উদার এবং সকলকে আপন করে নেওয়ার বার্তা দেয়। তাঁর মতে, ধর্মের আসল অর্থ বোঝার পরিবর্তে মানুষ অনেক সময় বাহ্যিক বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়, যার ফলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
আরও পড়ুনঃ মেয়ের চোখের জলেই বদলে গিয়েছিল জীবনের পথ! এক সময়ের দাপুটে খলনায়িকা, কোন ঘটনার পর রাতারাতি বদলে ফেলেছিলেন নিজের পরিচিতি? একসঙ্গে পাঁচটি ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অনামিকা সাহা! এত বড় সিদ্ধান্তের নেপথ্যের কারণ নিয়ে মুখ খুললেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী!
সাক্ষাৎকারের শেষ পর্বে বর্তমান সময়ের তারকাসন্তান বা ‘নেপো কিড’দের প্রসঙ্গও উঠে আসে। এই বিষয়ে মমতা শঙ্কর অত্যন্ত সংযত মন্তব্য করেন। তিনি জানান, তাঁর পরিবার কখনও তাঁকে বিশেষ পরিচয়ের সুযোগ নিতে শেখায়নি। উদয় শঙ্কর, অমলা শঙ্কর কিংবা রবিশঙ্করের মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বদের পরিবারে বড় হলেও তাঁরা কখনও সেই পরিচয়কে অহংকারের বিষয় করে তোলেননি। বরং সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন এবং মানবিক মূল্যবোধকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। মমতা শঙ্কর বলেন, নাম, খ্যাতি, অর্থ কিংবা বিলাসিতা কোনওটাই চিরস্থায়ী নয়। এগুলো জীবনের সাময়িক অংশ মাত্র। একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মানবিকতা, ব্যবহার এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায়। তাঁর কথায়, “জীবন মানে শুধু নাম বা অর্থ নয়, জীবন মানে একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠা।” সমাজ, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ নিয়ে তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।






