“পৃথিবীতে অরাজনৈতিক বলে কিছু হয় না, এত বড় স’ন্ত্রাস কোনও ভোটে হয়নি..ভারতবাসীর চাহিদা ভীষণ কম, আর সেই সুযোগই নিচ্ছে এই রাজনৈতিক দল” কোন অভিজ্ঞতা থেকে এমন মন্তব্য চন্দন সেনের? ২০১১-১৩-র ব্যক্তিগত সং’গ্রাম থেকে গণতন্ত্রের সং’কট নিয়ে মুখ খুললেন অভিনেতা!

বাংলা থিয়েটার ও অভিনয় জগতের অন্যতম পরিচিত মুখ চন্দন সেন বরাবরই শুধুমাত্র একজন অভিনেতা বা নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মঞ্চ ও পর্দার বাইরে সমাজ, রাজনীতি, গণতন্ত্র, সংস্কৃতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে তিনি বারবার স্পষ্ট ও খোলামেলা মতামত প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম থেকে শুরু করে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, থিয়েটারের ভবিষ্যৎ, সামাজিক মেরুকরণ, প্রযুক্তির প্রভাব এবং গণতন্ত্রের সংকট একাধিক বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি। চন্দন সেনের বক্তব্যে যেমন উঠে এসেছে তাঁর শৈশব ও সংগ্রামের কাহিনি, তেমনই উঠে এসেছে দেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ।

সাক্ষাৎকারে চন্দন সেন বলেন, একজন মানুষ যত বড় অপরাধীই হোক না কেন, তিনি “মনুষ্যরূপী জানোয়ার” বা ধর্ষক হিসেবে অভিযুক্ত হলেও তারও কিছু মৌলিক অধিকার থাকে। রাজনৈতিক হিংসা ও দলবদলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অতীতের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, এক সময় তাঁকে আক্রমণ করেছিল সিপিএম কর্মীরাই, যাদের অনেকেই পরে তৃণমূল এবং বর্তমানে বিজেপির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও হিংসার সংস্কৃতি বদলায়নি বলেই তাঁর ইঙ্গিত। একইসঙ্গে তিনি জানান, ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তাঁর কার্যত কোনো কাজ ছিল না। সেই কঠিন সময়ে তাঁর মা এবং পরিবারের সমর্থনই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পেশাগত বঞ্চনা এবং সামাজিক উপহাসের মধ্যেও তিনি নিজের মতাদর্শ ও অবস্থান থেকে সরে আসেননি।

শিল্পচর্চা ছেড়ে অন্য পথে হাঁটার পরামর্শও তিনি পাননি, বরং পরিবার তাঁকে নিজের সৃজনশীল পথেই এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছিল। রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চন্দন সেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “পৃথিবীতে অরাজনৈতিক বলে কিছু হয় না।” তাঁর মতে, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রই কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। ভারতীয় সমাজের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ভারতবাসীর চাহিদা ভীষণ কম”, আর সেই সীমিত চাহিদাকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে এসেছে। বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গেও তিনি সরব হন। তাঁর মতে, সমাজে যে বিভাজন ও মেরুকরণ আজ দৃশ্যমান, তার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। একইসঙ্গে তিনি বামপন্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। সিঙ্গুর আন্দোলন কিংবা প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে বিচার করলে চলবে না।

বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের ভূমিকাই রয়েছে, আর সেগুলিকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখা জরুরি। নাটক এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পচর্চা নিয়ে চন্দন সেনের উদ্বেগও স্পষ্ট। তিনি “থিয়েটার কর্মী” শব্দের বদলে “থিয়েটার শিল্পী” শব্দ ব্যবহারের পক্ষপাতী। তাঁর মতে, শিল্পের মূল শক্তি হলো বৌদ্ধিক চর্চা, আত্মসমালোচনা এবং প্রশ্ন করার ক্ষমতা। কিন্তু বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যম, রিল সংস্কৃতি এবং মোবাইল নির্ভরতা সেই ক্ষমতাকে ক্ষয় করছে। তিনি ‘নোমোফোবিয়া’র প্রসঙ্গ টেনে বলেন, মানুষ ক্রমশ ফোনের দাসে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, অ্যালগরিদম মানুষের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তার বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।

আরও পড়ুনঃ হিন্দু হয়েও বছরের পর বছর নিয়মিত বোরখা পরতেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়! কেরিয়ারের জন্য নয়, অন্য কারণেই ছিল অভিনেত্রীর সিদ্ধান্ত! এতদিন চাপাই ছিল, তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদের জীবনের চর্চিত অধ্যায় ফের আলোচনায়!

থিয়েটারের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে হলে বৌদ্ধিক বিতর্ক, নিরীক্ষা এবং বিকল্প ভাবনার চর্চা বাড়াতে হবে। সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল সাম্প্রতিক নির্বাচন এবং গণতন্ত্র নিয়ে তাঁর মন্তব্য। চন্দন সেন দাবি করেন, এবারের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা তাঁর মতে গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “এত বড় সন্ত্রাস কোনো ভোটে হয়নি।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ তুলেছেন এবং এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা হওয়া উচিত। যদিও তিনি নতুন সরকারের কিছু পদক্ষেপের প্রশংসাও করেন। বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্রে মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সংলাপ বন্ধ হয়ে গেলে সমাজের ক্ষতি হয়। ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মিশেলে চন্দন সেনের এই সাক্ষাৎকার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

You cannot copy content of this page