বাংলা নাট্য এবং অভিনয় জগতের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ ‘চন্দন সেন’ (Chandan Sen) বরাবরই সমাজ, রাজনীতি এবং পরিবেশ নিয়ে নিজের মতামত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। অভিনয়ের পাশাপাশি দেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার জন্যও তিনি পরিচিত। সম্প্রতি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে গণতন্ত্র, রাজনীতি, পরিবেশ ধ্বংস, উন্নয়নের ধরন এবং মানুষের সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে একাধিক মন্তব্য করেন তিনি। এর আগেও তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীতে অরাজনৈতিক বলে কিছু হয় না এবং দেশের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে মানুষের আরও বেশি সচেতন হওয়া দরকার। সেই আলোচনার মধ্যেই এবার পরিবেশ নিয়ে তাঁর বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
সাক্ষাৎকারে বিজেপির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে চন্দন সেন কড়া সমালোচনা করেন। তাঁর কথায়, দেশের এক বা কয়েকজন মানুষের অতিরিক্ত লোভের কারণে প্রকৃতির যে ক্ষতি হচ্ছে, তা কল্পনারও বাইরে। তিনি বলেন, “দেশের একজন বা দশজনের অতিরিক্ত লোভের জন্য যে ক্ষতিটা হচ্ছে, অকল্পনীয়। যেখানে লোক দেখিয়ে একটা গাছ লাগাচ্ছে আর পেছনে ১৩ টা জঙ্গল কেটে সাফ করে দিচ্ছে।” তাঁর দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই এমন গাছ লাগানো হয়, যা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় তেমন কোনও কার্যকর ভূমিকা পালন করে না। সেই গাছের শিকড়ও খুব বেশি বিস্তৃত হয় না এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের জন্য বড় উপকার বয়ে আনে না বলেই তাঁর মত।
চন্দন সেন আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেভাবে লাগাতার জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে, তা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর বক্তব্য, বিজ্ঞানীরাও বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। তিনি বলেন, “যে পরিমাণ গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে, জঙ্গল ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে আমাদের দেশ জুড়ে, বিজ্ঞানীরা তো জানিয়েই দিয়েছেন এই বছর গরমে ২০০ জনের উপর মানুষ মারা যাবে।” তাঁর মতে, শুধুমাত্র প্রতীকী কর্মসূচি পালন করলেই পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে বনভূমি রক্ষা এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি অতীতের একটি ঘটনাও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, “এমন নয় যে এটা আজকের, সিঙ্গুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জঙ্গল কেটে ‘ভোরের আলো’ নামের ইকো রিসোর্ট বানানোর চেষ্টা করেছিলেন।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইকো’ শব্দ ব্যবহার করলেই কোনও প্রকল্প পরিবেশবান্ধব হয়ে যায় না। তাঁর মতে, অনেক সময় এই ধরনের নামের আড়ালেই প্রকৃতির বড় ক্ষতি ঘটে। আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চীন এবং জাপানের মতো দেশ দেখিয়ে দিয়েছে যে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভর না করেও উন্নয়নের পথ তৈরি করা সম্ভব। অথচ ভারত, রাশিয়া এবং আফ্রিকার একাধিক অঞ্চলে এখনও বনভূমি কেটে খনি, আবাসন এবং নানা নির্মাণকাজের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ “আমার ঘে’ন্না লাগছে এইসব নিয়ে কথা বলতে…এই মানসিকতা বদলানো খুব দরকার, এভাবে আর কতদিন চলবে?” কোন বিষয়ে প্রকাশ্যে ক্ষো’ভ উগরে দিলেন মমতা শঙ্কর? শুধু নাম বা অর্থ নয়, জীবনের আসল শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সমাজের উদ্দেশ্যে কী বার্তা বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর?
পরিবেশ, রাজনীতি এবং উন্নয়ন নিয়ে নিজের বক্তব্যের শেষে চন্দন সেন স্পষ্ট করে জানান, উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেই ফিরে আসে। তাঁর মতে, এই বিষয়গুলোকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবেও ভাবা দরকার। ব্যক্তিগত সংগ্রাম থেকে শুরু করে গণতন্ত্র, সমাজ, পরিবেশ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার ইতিমধ্যেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিনেতার এই মন্তব্যগুলিও সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।






