রুপোলি পর্দায় যে গল্প দর্শক দেখেন, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে আরও অসংখ্য অজানা গল্প। বড় বড় সিনেমা কিংবা জনপ্রিয় ধারাবাহিকের শুটিং সেটে কখনও হাসি-ঠাট্টা, কখনও অপ্রত্যাশিত বিপত্তি, আবার কখনও এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা বছরের পর বছর ধরে শিল্পীদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকে। ক্যামেরার সামনে নিখুঁত অভিনয়ের জন্য যতটা প্রস্তুতি থাকে, ক্যামেরার আড়ালে ঠিক ততটাই থাকে আবেগ, পরিশ্রম আর মুহূর্তে তৈরি হওয়া নানা নাটকীয় পরিস্থিতি। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের অভিনয় জীবনের এমনই এক ঘটনা আজও টলিপাড়ায় কিংবদন্তির মতো শোনা যায়।
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে সুচিত্রা সেন শুধুই একজন অভিনেত্রী নন, তিনি এক অনন্য অধ্যায়। তাঁর সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব, অভিনয় দক্ষতা এবং রহস্যময় উপস্থিতি আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে। ১৯৫৭ সালের ৩০ মার্চ মুক্তি পেয়েছিল পরিচালক সুনীল মজুমদারের ছবি ‘শুভরাত্রি’। ছবিতে সুচিত্রা সেনের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন বসন্ত চৌধুরী। সেই ছবির শুটিংয়ের সময় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আজও বাংলা চলচ্চিত্রের অন্তরালের অন্যতম মজার কাহিনি হিসেবে পরিচিত। ঘটনাটির কেন্দ্রে ছিলেন সুচিত্রা সেন, পরিচালক সুনীল মজুমদার এবং ছবির প্রযোজক কানাই মুখোপাধ্যায়।
শুটিংয়ের আগের দিন পরিচালক সুনীল মজুমদার সুচিত্রা সেনকে জানিয়েছিলেন, পরদিন একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের দৃশ্য এক শটে ধারণ করার চেষ্টা করা হবে। সেই দৃশ্যে তাঁকে এক গ্লাস দুধ খেতে হবে বলেও আগাম জানিয়ে দেন পরিচালক। সুচিত্রা সেনও হেসে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তিনি দুধ খাবেন এবং শটও ঠিকঠাক দেবেন। পরদিন শুটিং ফ্লোরে যথারীতি শুরু হয় কাজ। মেজাজ ছিল একেবারে ফুরফুরে। ইউনিটের সদস্যদের সঙ্গে মজা করা, পরিচালকের সঙ্গে খুনসুটি সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত পরিবেশ। এমনকি একটি দৃশ্য বোঝানোর সময় সুচিত্রা সেন মজা করে পরিচালককেই অভিনয় করে দেখাতে বলেন। ভারী চেহারার সুনীল মজুমদার কষ্ট করে দৃশ্যটি অভিনয় করে দেখাতেই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়েন সুচিত্রা সেন। ইউনিটের সকলেই তখন হাসিতে ফেটে পড়েন।
এরপর আসে সেই বহুচর্চিত দুধের দৃশ্য। প্রযোজক কানাই মুখোপাধ্যায় আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি বাড়ি থেকে খাঁটি দুধ এনে দেবেন। কিন্তু শুটিংয়ের সময় দেখা গেল, গ্লাসে আসল দুধ নয়, জলের সঙ্গে খড়ির গুঁড়ো মিশিয়ে দুধের মতো রং তৈরি করা হয়েছে। গ্লাস হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখেই সুচিত্রা সেন বুঝে ফেলেন বিষয়টি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে পরিচালককে বলেন, “এ তো দুধ নয়, দুধের মতো করা হয়েছে। এটা আমি খাব কী করে?” বিষয়টি জানাজানি হতেই প্রচণ্ড রেগে যান সুনীল মজুমদার। তিনি ইউনিটের সবাইকে নির্দেশ দেন, প্রযোজক কানাই মুখোপাধ্যায়কে খুঁজে বের করতে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মুহূর্তের মধ্যে প্রযোজক যেন উধাও! অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তাঁর আর কোনও হদিস পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত সময় বাঁচাতে ক্যামেরাম্যান রামানন্দী সেনগুপ্তের সহযোগিতায় দৃশ্যটি এমনভাবে ধারণ করা হয়, যাতে মনে হয় সুচিত্রা সেন সত্যিই দুধ খাচ্ছেন। বাস্তবে অবশ্য তিনি শুধু গ্লাসটি ঠোঁটে ছুঁইয়ে অভিনয় করেছিলেন।
আরও পড়ুনঃ ‘চড়া মেকআপ,ভারী গয়না, নাচ-গান আর ঘনি’ষ্ঠ দৃশ্যতেই শেষ…সিরিয়াল বা সিনেমার একই হাল!’ বর্তমানে বাংলা বিনোদনের মান নিয়ে বি’স্ফোরক মন্তব্য লিলি চক্রবর্তীর! অভিনয় কি সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছে জৌলুসের আড়ালে? বাহ্যিক চাকচিক্যই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি? আপনারাও কি বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর সঙ্গে একমত?
শুটিং শেষ হওয়ার পর জানা যায়, পুরো দিনটাই প্রযোজক কানাই মুখোপাধ্যায় সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিগত বুইক গাড়ির ভেতরে লুকিয়ে ছিলেন, শুধুমাত্র পরিচালকের রাগ এড়ানোর জন্য। দিনের কাজ শেষ করে গাড়িতে উঠতে গিয়ে সুচিত্রা সেন নিজেই তাঁকে দেখতে পান। প্রযোজকের মুখের ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থা দেখে তিনি নাকি হাসি চেপে রাখতে পারেননি। এই মজার ঘটনাটি পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্দরমহলের অন্যতম জনপ্রিয় স্মৃতিতে পরিণত হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয়, কানাই মুখোপাধ্যায় পরবর্তীকালে ‘শহরে ইতিকথা’-র মতো সফল ছবিও প্রযোজনা করেছিলেন। তবে ‘শুভরাত্রি’র শুটিংয়ে দুধের বদলে খড়ি মেশানো জল আর প্রযোজকের সারাদিন গাড়িতে লুকিয়ে থাকার সেই ঘটনা আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য হাস্যরসের অধ্যায় হয়ে রয়েছে।






