বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কয়েক দশক ধরে নিজের অভিনয়ের ছাপ রেখে চলেছেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী ‘লিলি চক্রবর্তী’ (Lily Chakravarty)। বড়পর্দায় অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় করার পাশাপাশি কাজ করেছেন বাংলা সিনেমার একাধিক কিংবদন্তি পরিচালকের সঙ্গে। সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে বহু প্রথিতযশা নির্মাতার ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের কাছে সমানভাবে প্রশংসিত। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে সময়ের পরিবর্তন, বাংলা ছবির বিবর্তন এবং অভিনয়ের ধরনে নানান বদল খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। মাঝেমধ্যে ছোটপর্দাতেও কাজ করলেও, বরাবরই সিনেমাকেই নিজের সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম বলে মনে করেছেন এই অভিনেত্রী।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, দর্শকরা কি আর কখনও তাঁকে টেলিভিশনের ধারাবাহিকে দেখতে পাবেন? উত্তরে লিলি চক্রবর্তী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “না, আর সিরিয়াল করবই না ঠিক করেছি। নিম ফুলের মধুই শেষ ছিল। ওখানেও শেষের দিকে আর ভালো লাগত না, অনেকক্ষণ বসে থাকতে হতো…তার থেকে বাড়িতেই বসে থাকব, তবু সিরিয়ালে অভিনয় করব না!” তাঁর এই মন্তব্য থেকেই পরিষ্কার, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার পর তিনি আর দৈনিক ধারাবাহিকের ব্যস্ত জীবনে ফিরতে চান না। বরং নিজের মতো সময় কাটানোই এখন তাঁর কাছে বেশি স্বস্তির।
এরপর কথাবার্তা ঘুরে যায় বাংলা সিনেমার বর্তমান পরিস্থিতির দিকে। জানতে চাওয়া হয়, একসময়ের বাংলা ছবির জনপ্রিয়তা ও আবেগ আজ কেন অনেকটাই কমে এসেছে বলে মনে হয়। এই প্রসঙ্গে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন অভিনেত্রী। তিনি বলেন, “এখন আর ‘দেয়া নেয়া’র মতো ছবি হয় না। সেদিনই দেখছিলাম আবার, কি অভিনয়, পরিচালনা আর স্বাভাবিকতা…এখন তো দেখি অভিনয়ের থেকে বেশি চড়া মেকআপ, গয়না আর অসংখ্য গান বাজনা দিয়ে ধারাবাহিক আর ছবি হয়। তখন এইসব ছিল না, অভিনয়টাই দেখা হতো। আমার মনে হয় যদি চরিত্র অনুযায়ী সাধারণ এবং মানানসই সাজ পোশাক হয় তো ভালো হবে।”
লিলি চক্রবর্তীর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে অভিনয়ের স্বাভাবিকতার প্রসঙ্গ। তাঁর মতে, দর্শকের কাছে একটি চরিত্র বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে অভিনেতার অভিনয় এবং চরিত্রের উপস্থাপনার মাধ্যমে। অযথা বাহুল্য, অতিরিক্ত সাজসজ্জা বা চমক দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায় না। বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রীর বিশ্বাস, চরিত্রের সঙ্গে মানানসই পোশাক, সংযত উপস্থাপনা এবং শক্তিশালী অভিনয়ই একটি ছবি বা ধারাবাহিককে দীর্ঘদিন দর্শকের মনে বাঁচিয়ে রাখে। বর্তমান সময়ে সেই বিষয়গুলির উপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার বলেই তাঁর ইঙ্গিত।
দীর্ঘ কর্মজীবনে বাংলা সিনেমার একাধিক স্বর্ণযুগের সাক্ষী থেকেছেন লিলি চক্রবর্তী। কিংবদন্তি পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা যেমন তাঁর ঝুলিতে রয়েছে, তেমনই বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। তাই অতীত এবং বর্তমান দুই সময়ের কাজের ধরন তুলনা করার সুযোগও তাঁর হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার জায়গা থেকেই তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক না কেন, একটি ভালো ছবির আসল শক্তি সবসময়ই অভিনয়, চিত্রনাট্য এবং পরিচালনার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
আরও পড়ুনঃ “শুধু ভালো গান নয়, আরও অনেক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ…” অদিতি মুন্সিকে ঘিরে সৌম্য চক্রবর্তীর ‘জেতার জন্য ঘনি’ষ্ঠতা’র বি’স্ফোরক অভিযোগে মুখ খুললেন, ‘সারেগামাপা’র সহ-প্রতিযোগী দীপন, দুর্নিবার ও শোভন! অদিতি কি সত্যিই গান গাইতে পারেন না, কী বললেন তিন শিল্পী?
অভিনয় জীবন থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার কথা না বললেও ছোটপর্দায় আর না ফেরার সিদ্ধান্তের কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন লিলি চক্রবর্তী। একই সঙ্গে বাংলা সিনেমার বর্তমান ধারা নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রীর মতে, দর্শকদের মন জয় করতে হলে বাহ্যিক জৌলুসের চেয়ে ভালো অভিনয়, বাস্তবসম্মত উপস্থাপনা এবং শক্তিশালী গল্পের উপরই বেশি জোর দেওয়া উচিত। তাঁর এই খোলামেলা মন্তব্য ইতিমধ্যেই অনুরাগীদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।






