সম্প্রতি অভিনেত্রী দেবলীনা দত্তকে একাধিক অনুষ্ঠানে আবেগপ্রবণ হয়ে কাঁদতে দেখা যাওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য শুরু হয়। ‘ছবিওয়ালা’ ছবির প্রচারপর্বে হোক বা ‘নেভারমাইন্ড’-এর প্রিমিয়ারে, বারবার তাঁর চোখে জল দেখে অনেকেই কটাক্ষ করেন। কেউ লেখেন, “একজন অভিনেত্রীকে আজকাল বিভিন্ন জায়গায় কাঁদতে দেখা যাচ্ছে!”, আবার কারও দাবি, “কান্না দিয়েই ভিউ বাড়াতে চাইছেন দেবলীনা।” যদিও এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে তাঁর কয়েকজন সহকর্মী প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানান। পরে একটি সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী নিজেই এই বিতর্ক নিয়ে মুখ খুলে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
দেবলীনা বলেন, “শুরু এটা দিয়ে করি, কারও জুতোয় পা না রেখে কথা বলা খুব সহজ। কিন্তু জুতোয় পা রাখলে, জুতোর মাপ, জুতোর উচ্চতা সবটা বোঝা গেলে, একটা কমেন্ট করে ফেলার পর আফসোস হতে পারে।” এরপর তিনি নিজের ছোটবেলার এক কঠিন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। মাত্র নয় বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর তিনি সেই শোক দীর্ঘদিন মেনে নিতে পারেননি। সেই সময় থেকেই তাঁর মধ্যে ‘নিহিলিজম’ নামে একটি মানসিক সমস্যার সূচনা হয়। অভিনেত্রীর কথায়, বাস্তববাদী মানুষ হওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ মৃত্যু তিনি আজও সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না, তখনই শুরু হয় নিহিলিজম অ্যাটাক। জীবনের বিভিন্ন সময়ে কোনও কাছের মানুষের মৃত্যু ঘটলেই তাঁর এই সমস্যা নতুন করে ফিরে এসেছে।
অভিনেত্রী জানান, প্রথমে স্কুলজীবনে, পরে উচ্চমাধ্যমিকে এবং কলেজের প্রথম বর্ষে একই ধরনের মানসিক আঘাতের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। প্রথমবার সাইকিয়াট্রিস্টের কাছেও যেতে হয়েছিল। সেই সময় তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে বিছানা থেকেও উঠতে পারতেন না। মা নিজের হাতে তাঁকে খাইয়ে দিতেন, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বমি হয়ে যেত। পরে ‘এক আকাশের নীচে’ ধারাবাহিক চলাকালীন তাঁর দাদুর মৃত্যুর পরও প্রায় আড়াই মাস ধরে একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। তিনি বলেন, সেই সময় সারাদিন কেঁদে কাটাতেন, আর সেই ঘটনার সাক্ষী ওই ধারাবাহিকের সহকর্মীরাও রয়েছেন।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে দেবলীনা বলেন, “বাবিন তো অনেক বছরের বন্ধু। ওঁর পরিবারের সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্ক। মাসি, দাদাভাই, প্রিয়াঙ্কা, সহজ, কুট্টুস, এদের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার পরিবারিক সম্পর্ক।” তাঁর কথায়, ‘ছবিওয়ালা’ ছবিতে খুব বেশি দিন আগেই তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। ছবির মুক্তির আগেই রাহুলের চলে যাওয়া তাঁর কাছে মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। তাই ছবির প্রচারে গিয়ে চোখে জল চলে আসাটা তাঁর কাছে একেবারেই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, “আমার জায়গায় যেই থাকত, তার মানসিক অবস্থা আমার মতোই হওয়ার কথা।” এমনকি এই ঘটনার পর তিনি চিকিৎসকের সঙ্গেও কথা বলেন। তখন চিকিৎসক তাঁকে পরামর্শ দেন, কান্না চেপে না রাখতে। কারণ তাঁর এই মানসিক সমস্যায় কান্না শুরু হলে তা থামাতে বিশেষ ওষুধ পর্যন্ত খেতে হয়।
শুধু ‘ছবিওয়ালা’ নয়, ‘নেভারমাইন্ড’ ছবির প্রিমিয়ারেও তাঁকে আবেগপ্রবণ হতে দেখা যায়। সেই প্রসঙ্গেও দেবলীনা স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, পরিচালক চৈতী ঘোষাল এবং তাঁর ছেলে অমর্ত্য রায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধুই পেশাদার নয়, পারিবারিক। তাঁর ভাষায়, “বাবি যতটা চৈতীদির ছেলে, ততটা আমার ছেলে। উনি নিজেও সেটা মনে করেন।” তিনি আরও বলেন, একজন শিল্পী হিসেবে নিজের অত্যন্ত কাছের মানুষের অসাধারণ কাজ দেখে আবেগাপ্লুত হওয়াটা অস্বাভাবিক হতে পারে না। তাঁর দাবি, শুধু তিনিই নন, সেই ছবি দেখে উপস্থিত অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তবে ক্যামেরা তাঁর মুখের সামনে থাকায় সেই মুহূর্তটাই সবার নজরে এসেছে।
আরও পড়ুনঃ “বাড়িতেই চোখের সামনে দিনের পর দিন স্বামীর পর’কীয়া আর সহ্য করতে পারিনি!” একরত্তি মেয়েকে নিয়েই বাধ্য হয়ে সংসার ছেড়েছিলেন মল্লিকা বন্দ্যোপাধ্যায়! টেলিভিশনের খলনায়িকার বাস্তব জীবন বড়ই ক’ষ্টের! জানেন, সমাজের সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়া’ইয়ে কীভাবে মায়ের একটিমাত্র আশ্বাসই বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবন?
সবশেষে দেবলীনা দত্ত বলেন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সম্পর্কের গভীরতা এবং শিল্পের প্রতি সংবেদনশীলতাই তাঁকে সহজে আবেগপ্রবণ করে তোলে। তিনি বলেন, “আমার শৈল্পিক মন এতটাই নরম, আমি জীবনের সম্পর্ক নিয়ে এতটাই যত্নশীল। সম্পর্কগুলো এতটাই গভীর যে আমি আমার কাছের মানুষকে হারালে কাঁদি। আমার তাঁদের কথা বারবার মনে পড়ে। আমার কাছের মানুষ ভালো কাজ করলে চোখে জল আসে।” পাশাপাশি তিনি প্রশ্নও তোলেন, “যাঁকে ভালোবাসি, তাঁর ভালো কাজ দেখে, আমার চোখে জল আসবে, এটাই কি স্বাভাবিক নয়?” অভিনেত্রীর এই খোলামেলা বক্তব্য সামনে আসার পর সামাজিক মাধ্যমেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই তাঁর বক্তব্যের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছেন, আবার এই বিতর্ক নিয়েও মতভেদ অব্যাহত রয়েছে।






