বাংলা চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে এমন বহু অজানা গল্প রয়েছে, যা কখনও ক্যামেরার সামনে আসেনি। দর্শকরা শুধু পর্দায় তারকাদের অভিনয় দেখেছেন, কিন্তু একটি ছবি তৈরি হওয়ার আগে কত পরিকল্পনা, কত স্বপ্ন, কত অসম্পূর্ণ ইচ্ছা আর কত অপ্রকাশিত ঘটনা থেকে যায়, তা খুব কম মানুষই জানেন। অনেক সময় একটি ছবির কাস্টিং থেকে শুরু করে চিত্রনাট্য নিয়ে তারকাদের ব্যক্তিগত আলোচনা এসবই বছরের পর বছর আড়ালে থেকে যায়। পরে কোনও ঘনিষ্ঠ মানুষ বা পরিবারের সদস্য সেই স্মৃতি ভাগ করে নিলে তবেই প্রকাশ্যে আসে বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সেই অজানা অধ্যায়। সম্প্রতি তেমনই এক চমকপ্রদ স্মৃতির কথা তুলে ধরেছেন অভিনেত্রী রীনা চৌধুরী।
রীনা চৌধুরী শুধু একজন অভিনেত্রীই নন, তিনি কিংবদন্তি পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার অঞ্জন চৌধুরীর কন্যা। দীর্ঘদিন ধরেই বাবার স্মৃতি, তাঁর কাজ এবং বাংলা সিনেমার নানা অজানা গল্প নিয়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে কথা বলতে দেখা যায় তাঁকে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমন কিছু তথ্য তুলে ধরেছেন, যা বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে নিঃসন্দেহে বিশেষ আগ্রহের বিষয়। বিশেষ করে মহানায়ক উত্তম কুমার, কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন এবং অঞ্জন চৌধুরীকে ঘিরে তাঁর বলা স্মৃতিচারণ ইতিমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
সাক্ষাৎকারে রীনা চৌধুরী জানান, তাঁর বাবা অঞ্জন চৌধুরী একসময় ‘পাখি’ নামে একটি ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। সেই গল্প এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে, তিনি ছবিটিতে উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেনকে একসঙ্গে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। রীনার কথায়, তাঁর বাবার মুখ থেকেই তিনি শুনেছিলেন যে উত্তম কুমার চিত্রনাট্যটি শুনে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, মহানায়ক নাকি নিজেই সুচিত্রা সেনকে ফোন করে বলেছিলেন, “রমা, তুমি ব্যাক করতে পারো, এমন একটা স্ক্রিপ্ট আমার কাছে এসেছে।” রীনা জানান, ফোনে এরপর ঠিক কী কথা হয়েছিল, তা তিনি জানেন না। তবে তাঁর বাবার সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে পূরণ হয়নি। কারণ, সেই সময়ের মধ্যে সুচিত্রা সেন অভিনয় জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে ছবিটি আর সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরি করা সম্ভব হয়নি। আজও সেই চিত্রনাট্য তাঁদের কাছেই সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানান তিনি।
শুধু ‘পাখি’ নয়, রীনা চৌধুরী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অঞ্জন চৌধুরীর আর একটি ছবিতে প্রথমে অভিনয় করার কথা ছিল উত্তম কুমারের। এমনকি মনোজ মিত্র যে চরিত্রে পরে অভিনয় করেছিলেন, সেই চরিত্রটিও প্রথমে মহানায়কের জন্যই ভাবা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎই উত্তম কুমারের প্রয়াণে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এরপর ছবির কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্বের পরিবর্তন হয় এবং অন্য শিল্পীদের নিয়ে কাজ সম্পূর্ণ করা হয়। রীনা বলেন, আজও যদি কল্পনা করা যায় যে ওই চরিত্রে উত্তম কুমার অভিনয় করছেন, তাহলে ছবিটির আবেদন হয়তো আরও অন্য মাত্রা পেত। তাঁর মতে, মহানায়কের উপস্থিতি যে কোনও চরিত্রকেই আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারত।
আরও পড়ুনঃ “ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত যদি বু*ক দেখায়, পে*ট দেখায়, পে*ছন দেখায় তাতে তোর কী?” “ইন্ডাস্ট্রির অংশ হয়েই ইন্ডাস্ট্রির মেয়েদের নোং’রা ক’টাক্ষ, তুমি নিজে কী কী করে বেড়িয়েছ আমাদের চোখের সামনে দেখা!” একজন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রীকে ছোট করার অধিকার কে দিয়েছে? বি*স্ফোরক কনীনিকার নিশানায় ইন্ডাস্ট্রির কোন ব্যক্তিত্ব?
রীনা চৌধুরীর এই স্মৃতিচারণ শুধু একটি অসম্পূর্ণ ছবির গল্প নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিলও বলা যায়। উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনকে আবার একসঙ্গে পর্দায় ফিরিয়ে আনার যে স্বপ্ন অঞ্জন চৌধুরী দেখেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত না হলেও সেই ইচ্ছার কথা আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আবেগ ছুঁয়ে যায়। একই সঙ্গে উত্তম কুমারের মতো একজন কিংবদন্তি শিল্পী একটি চিত্রনাট্য নিয়ে এতটা উৎসাহী ছিলেন এই তথ্যও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। রীনা চৌধুরীর মুখে শোনা এই অজানা কাহিনি তাই নতুন করে মহানায়ক, সুচিত্রা সেন এবং অঞ্জন চৌধুরীর সৃষ্টিশীল সম্পর্কের এক ভিন্ন দিক তুলে ধরেছে।






