বাংলা চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্প এবং স্মৃতির মিশেলে এক অন্য মাত্রা পেয়েছে। পর্দার আড়ালের বহু সম্পর্ক, অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা বিতর্ক আজও মানুষের কৌতূহলের বিষয়। তার অনেক কিছুরই নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই, তবু সেই ঘটনাগুলি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা চলেছে। মহানায়ক উত্তম কুমারের (Uttam Kumar) শেষ দিনগুলিকে ঘিরেও এমনই একটি বহুচর্চিত ঘটনা আজও সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে সমান আগ্রহের বিষয় হয়ে রয়েছে। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উত্তম কুমারের নাম এক অনন্য অধ্যায়।
তাঁকে ছাড়া টলিউডের স্বর্ণযুগের ইতিহাস যেন অসম্পূর্ণ। অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং অসাধারণ পর্দা উপস্থিতির জন্য তিনি আজও বাঙালির ‘ম্যাটিনি আইডল’। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল গোটা বাংলা। মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু শুধু চলচ্চিত্র জগতের নয়, লক্ষ লক্ষ অনুরাগীর কাছেও ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পরে তাঁর শেষ শুটিং, শেষ দিন এবং সেই সময়ের নানা বিতর্ক এখনও আলোচনায় ফিরে আসে। সেই সময় সলিল দত্ত পরিচালিত ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির শুটিং চলছিল। ছবিতে উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় এবং সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়।
বহুল প্রচলিত একটি ঘটনার দাবি, শুটিংয়ের দিন উত্তম কুমারের নিজস্ব মেকআপ রুমে সমস্যা থাকায় তাঁকে অন্য একটি ঘর ব্যবহার করতে বলা হয়। কিন্তু সেই ঘরে তখন মেকআপ করছিলেন মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। স্টুডিওর এক কর্মী নাকি উত্তমকুমারকে জানিয়েছিলেন, ভিতরে একজন বড় অভিনেত্রী মেকআপ করছেন এবং কাউকে ঢুকতে বারণ করেছেন। পরে জানা যায়, সেই অভিনেত্রী ছিলেন মৌসুমী। এর কিছুদিন পরেই আসে বাংলা চলচ্চিত্র প্রেমীদের কথা বাংলা সংস্কৃতির জগতের অন্যতম অন্ধকার দিন, পরলোক গমন করেন মহানায়ক।
উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী সুপ্রিয়া দেবী একাধিক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন, সেদিন সেটের সেই ঘটনায় মহানায়ক মানসিকভাবে চরম আঘাত পেয়েছিলেন, জীবনের শেষদিকে এই অপমান মহানায়ক মেনে নিতে পারেননি। তাঁর কথায়, সরাসরি মৃত্যুর কারণ না হলেও ওই ঘটনাটি উত্তমকুমারকে গভীরভাবে আহত করেছিল। তবে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, উত্তম কুমার তাঁর কাছে শুধু সহ-অভিনেতা নন, পরিবারের অত্যন্ত কাছের মানুষ ‘উত্তমকাকু’। তিনি বলেন, তাঁকে মেকআপ রুম থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো স্পর্ধা বা সাহস তাঁর কোনওদিনই ছিল না।
বরং তিনি দাবি করেন, উত্তম কুমার যে তাঁর ঘরে এসেছিলেন, সেই খবরই তাঁর কাছে পৌঁছয়নি। আরও জানান, মৃত্যুর ঠিক আগে উত্তম কুমার নাকি বলেছিলেন, দু’দিন পরে তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। কিন্তু সেই দিন আর আসেনি। অন্যদিকে চিকিৎসক ও ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, অতিরিক্ত কাজের চাপ, ব্যক্তিগত জীবনের মানসিক চাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতির বড় কারণ ছিল। এই বিতর্ক এখানেই থেমে যায়নি। উত্তম কুমারের মৃত্যুর প্রায় আট বছর পরে ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেন সুপ্রিয়া দেবী ও মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। তখন তাঁদের সম্পর্ক খুব একটা স্বাভাবিক ছিল না বলেই ইন্ডাস্ট্রিতে আলোচনা চলত।
আরও পড়ুনঃ ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে ম’র্মান্তিক দুর্ঘ’টনা! ১৩ ফুট উঁচু ছাদ থেকে পড়ে জীবন-মৃ’ত্যুর সন্ধিক্ষণে সলমন খান!
ছবিতে সুপ্রিয়া দেবী ছিলেন কঠোর শাশুড়ির চরিত্রে, আর মৌসুমী ছিলেন পুত্রবধূ। দু’জনের অভিনয়ই দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। সেই সময় কেউ কেউ মন্তব্য করেছিলেন, পর্দায় সুপ্রিয়ার কঠোর অভিনয়ে যেন ব্যক্তিগত ক্ষোভেরও প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। যদিও এর কোনও প্রমাণ নেই। অন্যদিকে মৌসুমীও পরে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, উত্তম কুমারকে নিয়ে তাঁর নামে যে সব কথা ছড়িয়েছিল, সেগুলি ভিত্তিহীন। এত বছর পরেও ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র সেটে ঠিক কী ঘটেছিল, তার নির্ভুল উত্তর আজও অজানা। ফলে ঘটনাটি ইতিহাসের একটি বহুচর্চিত কিন্তু বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে।






