পর্দায় যাঁদের আমরা দেখি, তাঁদের অভিনয়, সংলাপ বা চরিত্র নিয়েই সাধারণত আলোচনা হয়। কিন্তু ক্যামেরার বাইরের জীবন, সংগ্রাম, শিল্পচর্চা কিংবা ব্যক্তিগত পথচলার গল্প অনেক সময়ই অজানাই থেকে যায়। অথচ একজন শিল্পীর সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ সাধনা, পরিশ্রম এবং বহু বছরের অভিজ্ঞতা। বাংলা বিনোদন জগতের এমনই এক বর্ষীয়ান শিল্পী দুলাল লাহিরী, যিনি শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, নাট্যনির্দেশক, গায়ক এবং তবলাবাদক হিসেবেও নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলা থিয়েটার, সিনেমা ও টেলিভিশনে তাঁর অবদান আজও দর্শকদের কাছে সমানভাবে স্মরণীয়।
বাংলা চলচ্চিত্রের নব্বইয়ের দশকের দর্শকদের কাছে দুলাল লাহিরী মানেই পর্দার এক শক্তিশালী খলনায়ক। তাঁর সংলাপ, অভিনয়ের তীক্ষ্ণতা এবং পর্দায় উপস্থিতি একাধিক ছবিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছিল। তবে শুধু নেতিবাচক চরিত্রেই নয়, ইতিবাচক ভূমিকাতেও তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন। বর্তমানে ৭৮ বছর বয়সেও তিনি অভিনয় এবং থিয়েটারের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। সুযোগ পেলেই সিনেমা বা ধারাবাহিকে কাজ করছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও শিল্পের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে এখনও সমান উদ্যমে কাজ করে যেতে অনুপ্রাণিত করছে।
১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার পাবনায় জন্ম দুলাল লাহিরীর। দেশভাগের পর তাঁর বাবা সত্যদাস লাহিরী পরিবারকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতার স্কটিশ চার্চ স্কুলে পড়াশোনার সময় থেকেই নাটক, গান এবং তবলা বাজানোর প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। বিদ্যালয় ও পাড়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত নাটক করতেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুকুট’ ছিল তাঁর অভিনীত প্রথম নাটক। পরে বন্ধুদের নিয়ে ‘পাঞ্চন্য’ এবং ‘শিল্পী যাযাবর’ নামে দুটি নাট্যদলও গড়ে তোলেন। নাট্যজীবনের শুরুতেই মনোজ মিত্র ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের সান্নিধ্য পান। তাঁদের কাছ থেকেই অভিনয়ের নানা সূক্ষ্ম দিক শেখার সুযোগ হয়, যার কথা তিনি বিভিন্ন সময়ে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।


থিয়েটারের মঞ্চে দীর্ঘদিন কাজ করার পর দুলাল লাহিরী চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। ১৯৮৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অগ্নি সংকেত’ ছবির মাধ্যমে তাঁর বড়পর্দায় আত্মপ্রকাশ। এরপর ‘চেতনা’, ‘তোমার রক্তে আমার সোহাগ’, ‘রক্ত নদীর ধারা’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘কথা ছিল’, ‘লাঠি’, ‘ভয়’, ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’, ‘মধুমালতি’, ‘কুলাঙ্গার’ এবং ‘অন্নদাতা’-সহ বহু জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করেন। নব্বইয়ের দশকে বাংলা সিনেমার অন্যতম পরিচিত খলনায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। পাশাপাশি থিয়েটারেও সমানভাবে সক্রিয় ছিলেন। ‘রাজকুমার’, ‘স্বর্গ-নরক’, ‘দম্পতি’, ‘উজান গঙ্গা’, ‘শত্রুমিত্র’, ‘অন্তর্ধান’ ও ‘দাদাঠাকুর’-এর মতো নাটকে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। ২০০৫ সালে ‘একদিন প্রতিদিন’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় আত্মপ্রকাশের পর একাধিক জনপ্রিয় ধারাবাহিকেও অভিনয় করেছেন।
আরও পড়ুনঃ ছোটপর্দায় প্রথম কাজের শুরুতেই দর্শকের মন কেড়েছেন ‘কুমকুম’-এর নায়িকা, কিন্তু পর্দার বাইরের অনুষ্কা হালদার ঠিক কেমন? অভিনয়ের বাইরেও রয়েছে রয়েছে অনেক বিশেষ গুণ! প্রিয় খাবার কী? কতদূর পর্যন্ত করেছেন পড়াশোনা? জেনে নিন, নবাগত অভিনেত্রীর জীবনের অজানা গল্পগুলো!
অভিনয়ের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনেও দুলাল লাহিরী একজন পারিবারিক মানুষ। তাঁর স্ত্রী সীমা লাহিরী। তাঁদের দুই ছেলে মানস ও সুপ্রতিম। দুই ছেলেরই বিয়ে হয়েছে এবং পরিবার নিয়ে সুখে-শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। কাজের ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি ভালোবাসেন। একই সঙ্গে এখনও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করছেন। কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে তিনি যে নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং শিল্পপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন, তা বাংলা বিনোদন জগতের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।






