দ্বিতীয় বিশ্বযু’দ্ধের পর জেলব’ন্দী স্বামী, বাধ্য হয়েই অভিনয় জগতে পা রাখেন করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়! শুরুতেই মুখের উপর ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের প্রস্তাব! জানেন, ‘পথের পাঁচালী’র কালজয়ী চরিত্র ‘সর্বজয়া’র বাস্তব জীবনের করুণ কাহিনী? কে ছিলেন করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বামী?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের কাজের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও প্রভাব আজও অমলিন। তাঁদের অন্যতম করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় (Karuna Banerjee)। অভিনেত্রী হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন প্রগতি আন্দোলনের কর্মী, গল্পকার, চলচ্চিত্র-সমালোচক এবং সংস্কৃতিমনস্ক এক ব্যক্তিত্ব। তবে সাধারণ দর্শকের কাছে তাঁর পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে একটি নাম ‘সর্বজয়া’। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’-এ সর্বজয়ার চরিত্রে তাঁর অভিনয় শুধু বাংলা সিনেমাই নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রেও বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। নিজের সংযত, স্বাভাবিক এবং গভীর অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি এমন এক মায়ের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছিলেন, যা আজও দর্শকের মনে একই রকম আবেগ জাগায়।

করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় নিঃসন্দেহে ‘পথের পাঁচালী’। মজার বিষয় হল, প্রথমে তিনি এই ছবিতে অভিনয় করতেই রাজি ছিলেন না। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় সিনেমা নিয়ে তাঁর মনে নানা দ্বিধা ও সামাজিক সংকোচ ছিল। এমনকি সত্যজিৎ রায়কে তিনি পোস্টকার্ড লিখে জানিয়েছিলেন, “পারব না, করব না।” পরে স্বামী সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্বশুর সুনীতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শাশুড়ি নলিনী বন্দ্যোপাধ্যায়ের উৎসাহেই তিনি মত বদলান। শুটিং শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সর্বজয়ার চরিত্রে মিশিয়ে দেন। ‘পথের পাঁচালী’-র সাফল্যের পর ‘অপরাজিত’, ‘দেবী’ ও ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-সহ সত্যজিৎ রায়ের আরও কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন।

তাঁর অভিনয়ের স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক স্তরেও পৌঁছেছিল, ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস (বাফটা)-এর বিদেশি অভিনেত্রীদের মনোনয়ন তালিকাতেও তাঁর নাম জায়গা করে নেয়। ১৯৪৩ সালে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিয়ে হয় সহপাঠী সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সুব্রত ছিলেন মার্ক্সবাদী আদর্শে বিশ্বাসী এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। তাঁদের বিয়ে শুধু পারিবারিক নয়, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেও নানা বাধার মুখে পড়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুব্রত সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, পরে কমিউনিস্ট পার্টির কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকায় আত্মগোপন করতে বাধ্য হন এবং একসময় জেলেও বন্দি হন। এই সময় করুণা একদিকে ছোট মেয়েকে মানুষ করেছেন, অন্যদিকে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন।

নিষিদ্ধ সময়ে গেরিলা কায়দায় পথনাটক, পোস্টার প্রচার এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির একজন সাহসী কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। অভিনয়ের জগতে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবেশ কোনও পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং সময় ও পরিস্থিতির হাত ধরেই তাঁর সেই যাত্রা শুরু। গণনাট্য সংঘে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেও সিনেমাকে তিনি নিজের পেশা হিসেবে ভাবেননি। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্রের ভাবনা এবং পরিবারের উৎসাহ তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। শুটিংয়ের কঠিন পরিবেশ, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং বারবার দৃশ্য ধারণের মতো বিষয় প্রথমদিকে তাঁকে অস্বস্তিতে ফেললেও ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেন, সাধারণ মানুষের জীবনকে সত্যিকার অর্থে তুলে ধরার জন্য চলচ্চিত্রও এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম।

আরও পড়ুনঃ ছোটপর্দায় প্রথম কাজের শুরুতেই দর্শকের মন কেড়েছেন ‘কুমকুম’-এর নায়িকা, কিন্তু পর্দার বাইরের অনুষ্কা হালদার ঠিক কেমন? অভিনয়ের বাইরেও রয়েছে রয়েছে অনেক বিশেষ গুণ! প্রিয় খাবার কী? কতদূর পর্যন্ত করেছেন পড়াশোনা? জেনে নিন, নবাগত অভিনেত্রীর জীবনের অজানা গল্পগুলো!

সেই উপলব্ধিই তাঁকে অভিনয়ের প্রতি আরও দায়বদ্ধ করে তোলে। পরবর্তী সময়ে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় মৃণাল সেন, শম্ভু মিত্র, অমিত মৈত্র, ভবেন্দ্রনাথ শইকিয়া ও ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো পরিচালকদের ছবিতেও অভিনয় করেন। তবু তিনি কখনও অভিনয়কে কেরিয়ার হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজের কথা বলার একটি মাধ্যম হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। বাণিজ্যিক ছবির একাধিক প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তিনি সবসময় অর্থবহ চরিত্রকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। ২০০১ সালের ১২ নভেম্বর ৮২ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হলেও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে ‘সর্বজয়া’ হিসেবে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম আজও একইভাবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

You cannot copy content of this page