হাসপাতালেই সদ্যোজাত সন্তানের মৃ’ত্যু, মা’রা যায় স্ত্রীও! ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বাস্তবেও প্রিয়জনকে হারানোর অসহনীয় ক’ষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন, ‘পথের পাঁচালী’র ‘অপুর’ মতোই বেদনায় ভরা সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন! শেষ বয়সে এখন কেমন আছেন অভিনেতা? সবটা জানলে চোখে আসবে জল!

বড় পর্দায় আমরা যে চরিত্রগুলো দেখি, সেগুলিই অনেক সময় ইতিহাস হয়ে যায়। কিন্তু সেই চরিত্রগুলোর আড়ালে থাকা মানুষগুলোর জীবনের গল্প অনেক ক্ষেত্রেই অজানাই থেকে যায়। ক্যামেরার সামনে কয়েক ঘণ্টার অভিনয় দর্শকের মনে অমর হয়ে থাকলেও, সেই শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনে কতটা আনন্দ, কতটা সংগ্রাম বা কতটা বেদনা লুকিয়ে থাকে, তা খুব কম মানুষই জানেন। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমনই এক নাম সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি মাত্র একটি ছবিতে অভিনয় করেই চিরকাল দর্শকের কাছে ‘অপু’ হয়ে রয়ে গিয়েছেন।

১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তির পর শুধু বাংলা নয়, বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই ছবিতে ছোট্ট অপুর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়। মজার বিষয় হল, তাঁর অভিনয় জগতে আসাটা ছিল একেবারেই ঘটনাচক্রে। জানা যায়, সত্যজিৎ রায় যখন অপুর চরিত্রের জন্য উপযুক্ত একটি শিশুর খোঁজ করছিলেন, তখন তাঁর স্ত্রী বিজয়া রায় তাঁদের বাড়ির পাশেই খেলতে থাকা এক ছোট্ট ছেলেকে দেখে সত্যজিৎকে জানান। এরপর সত্যজিৎ রায় সেই ছেলেটি এবং তার দাদাকে বাড়ির ছাদে ডেকে কয়েকটি ছবি তোলেন। সেই মুহূর্তেই তিনি ঠিক করে ফেলেন, এই ছেলেই হবে তাঁর ছবির অপু। সেই ছোট্ট ছেলেটিই ছিলেন সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়।

তবে সুবীরের সিনেমায় অভিনয়ের পথ মোটেই সহজ ছিল না। প্রথমদিকে তাঁর মা কোনওভাবেই ছেলেকে সিনেমায় অভিনয় করতে দিতে রাজি ছিলেন না। পরে সত্যজিৎ রায়ের অনুরোধে তিনি সম্মতি দিলেও একটি শর্ত দিয়েছিলেন এই ছবির পর আর কোনও ছবিতে যেন সুবীরকে অভিনয় করানো না হয়। শুধু তাই নয়, এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য কোনও পারিশ্রমিকও নেননি তাঁর পরিবার। ফলে ‘পথের পাঁচালী’ই হয়ে ওঠে সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম এবং শেষ ছবি। ছবিটি মুক্তির পর তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা পেলেও অভিনয় জগতের মোহে আটকে থাকেননি। বরং খুব দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গিয়ে পড়াশোনাতেই মন দেন। পরে যোগেশচন্দ্র কলেজ থেকে বি.কম পাশ করেন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং সম্পূর্ণ করেন এবং চাকরির জগতে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ ৩২ বছরের কর্মজীবনে ১২ বছর ক্লার্ক এবং পরবর্তী ২০ বছর টেকনিক্যাল বিভাগে কাজ করার পর ২০০১ সালে অবসর নেন।

তবে কর্মজীবনে স্থিতি এলেও ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক কঠিন আঘাত নেমে আসে তাঁর ওপর। নিজের মুখেই তিনি জানিয়েছেন, চিকিৎসায় গাফিলতির কারণে হাসপাতালেই মারা যায় তাঁর সদ্যোজাত সন্তান। সেই শোক কোনওভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারেননি তাঁর প্রথম স্ত্রী। সন্তানের মৃত্যুর প্রায় এক বছরের মধ্যেই তিনিও প্রয়াত হন। জীবনের এই পরপর দুই বড় ধাক্কা সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়কে দীর্ঘ সময় একাকীত্বের মধ্যে ঠেলে দেয়। প্রায় সাত বছর একা থাকার পর তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। বর্তমানে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ২৬ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। যদিও তাঁদের আর কোনও সন্তান হয়নি। জীবনের এই বেদনাময় অধ্যায় অনেকটাই যেন পর্দার অপুর সংগ্রামী জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়।

আরও পড়ুনঃ ‘কোনও প্রতিযোগিতা নেই, অনেকে এসেছেন, কিন্তু রচনা দির পর জায়গাটা…’ ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এর যাত্রা শুরু হতেই আত্মবিশ্বাসী নতুন ‘দিদি’ স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়! ১৭ বছর ধরে রচনার সঞ্চালনাকে কি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়লেন অভিনেত্রী? আপনাদের কেমন লাগছে স্বস্তিকার সঞ্চালনা?

বর্তমানে ৭৯ বছর বয়সি সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার কুদঘাটের চণ্ডী ঘোষ রোডে বসবাস করেন। অভিনয় জগত থেকে বহু আগেই সরে এলেও ‘অপু’ পরিচয় আজও তাঁর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে। স্কুল, কলেজ, চাকরির অফিস সর্বত্র মানুষ তাঁকে ‘পথের পাঁচালির অপু’ বলেই চিনেছেন। বাড়িতে গেলে এখনও তিনি সযত্নে তুলে রাখা ছবির অ্যালবাম দেখান, সত্যজিৎ রায় এবং ‘পথের পাঁচালী’-র শুটিংয়ের নানা স্মৃতি ভাগ করে নেন। মাত্র একটি ছবিতে অভিনয় করেও যে একজন শিল্পী প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে অমর হয়ে থাকতে পারেন, সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর জীবন শুধু একজন অভিনেতার গল্প নয়, বরং সাফল্য, আত্মসংযম, ব্যক্তিগত শোক এবং স্মৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকার এক অনন্য ইতিহাস।

You cannot copy content of this page