‘অত্যন্ত বিদুষী ও এলিট মহিলাদের মুখে আত্মরক্ষার জন্য মেয়েদের কীভাবে পোশাক পরা উচিত শুনে ঘৃ’ণা লাগে…বারুইপুরের বাচ্চা মেয়েটি কি জামাকাপড় খুলে ঘুরছিল?’ ধ*র্ষণের কারণ হিসেবে নারীর পোশাককে কাঠগড়ায় তোলার প্রবণতা নিয়ে বি*স্ফোরক কৌশিক সেন! শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জন করা শিক্ষা নয়, সমাজকে কী বার্তা দিলেন অভিনেতা?

টলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা কৌশিক সেন শুধু অভিনয়ের জন্যই নন, বরাবরই নিজের স্পষ্ট মতামতের জন্যও পরিচিত। সমাজ, রাজনীতি, নারী-পুরুষের সমতা কিংবা মানবিক মূল্যবোধ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই বারবার নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছেন তিনি। সম্প্রতি ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’ ছবির প্রচারে এক সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সমাজের বর্তমান পরিস্থিতি, সম্পর্কের জটিলতা, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং নারী নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন অভিনেতা। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আত্মসমালোচনার গুরুত্ব, সম্পর্কে পারস্পরিক সম্মান এবং সমাজের দীর্ঘদিনের মানসিক কাঠামো বদলানোর প্রয়োজনীয়তার কথা।

কৌশিক সেনের মতে, সমাজের পরিবর্তন কেবল আইন বা শাস্তির মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং মানুষের চিন্তাভাবনার পরিবর্তনই সবচেয়ে জরুরি। তিনি বলেন, একজন মানুষের মধ্যে আত্মসমালোচনার ক্ষমতা না থাকলে প্রকৃত পরিবর্তন আসে না। তাঁর কথায়, “তুমি যা করছ, যা বলছ, সেটাই একমাত্র সত্য তার বাইরে আর সত্য নেই, এই ভাবনা থেকেই বিনয়ের অভাব তৈরি হয়। আসলে ওটা এক ধরনের উইকনেস এবং এক ধরনের সেলফিশনেস।” সম্পর্ক নিয়েও স্পষ্ট মত প্রকাশ করেন অভিনেতা। তাঁর মতে, “কমপ্রোমাইজ করাটা একটা খুব বড় গুণ। তবে সেটা যদি ভালো কিছু বাঁচিয়ে রাখার জন্য হয়, তাহলে সেই কমপ্রোমাইজ এক্সেলেন্ট।” একইসঙ্গে তিনি জানান, সমাজ, পরিবার এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সবকিছুই সম্পর্কের ভিতকে প্রভাবিত করে এবং শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে কোনও সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকে না।

সাক্ষাৎকারে বর্তমান সময়ে নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা নিয়েও সরব হন কৌশিক সেন। তাঁর মতে, একজন ধর্ষক হঠাৎ করে তৈরি হয় না, বরং ছোটবেলা থেকেই নারীদের প্রতি অসম্মান করার মানসিকতা তার ভিতরে গড়ে ওঠে। অভিনেতার বক্তব্য, “পটেনশিয়াল রেপিস্ট আমাদের চারপাশেই ঘুরে বেড়ায়। সবাই শারীরিকভাবে ধর্ষণ করে না, কিন্তু তারা বেসিক্যালি মেয়েদের অসম্মান করে।” তিনি আরও বলেন, “একটা মেয়েকে তার প্রাপ্য সম্মানটা দাও। হঠাৎ করে একটা ছেলে একদিনে রেপিস্ট হয়ে যায় না। সেই বীজটা ছোটবেলা থেকেই থাকে।” তাঁর মতে, শুধুমাত্র অপরাধীর কঠোর শাস্তির দাবি করলেই হবে না, বরং ছোট থেকেই ছেলে-মেয়েদের সঠিক মূল্যবোধ এবং নারীদের প্রতি সম্মান শেখানো জরুরি।

নারীদের পোশাককে কেন্দ্র করে যে ধরনের মন্তব্য সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসে, তারও তীব্র সমালোচনা করেন কৌশিক সেন। তিনি বলেন, “সাম্প্রতিককালে এমন এমন বিদুষী, অত্যন্ত এলিট মহিলাদের এমন মন্তব্য করতে শুনছি যে মেয়েদের কীভাবে কাপড় পরা উচিত এটা ডিসগাস্টিং, শেমফুল।” বারুইপুরের ঘটনাকে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ও কি জামাকাপড় খুলে ঘুরছিল?” পাশাপাশি তিনি আরও বলেন, “যার নিজের বাড়িতে এরকম ঘটনা ঘটে গেছে, তিনি কী করে এমন কথা বলেন?” তাঁর মতে, সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত মানুষেরাও যখন নারীদের পোশাক বা জীবনযাপন নিয়ে দায় চাপানোর চেষ্টা করেন, তখন সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কৌশিকের ভাষায়, “আমাদের অভিনয় জগতেও অত্যন্ত সুশিক্ষিত, অত্যন্ত ভালো অভিনেত্রী বা শিল্পীদের এমন মন্তব্য করতে শুনি, ইটস ডিসগাস্টিং।” তাঁর বিশ্বাস, প্রকৃত শিক্ষা মানুষের মনন, বিনয় এবং মানবিকতা তৈরি করে, শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জন করলেই সেই শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না।

আরও পড়ুন: ফের ভারতে চোখ রাঙাচ্ছে চিনা ভাই’রাস! কোভিডে আ’ক্রান্ত হয়ে আশ’ঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি কুমার শানুর ছেলে জান!

সাক্ষাৎকারে নিজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও মুখ খোলেন কৌশিক সেন। তিনি দাবি করেন, কোনও ঘটনায় তিনি নীরব থাকেননি। অভিনেতার কথায়, “আমি যা যা বলেছি, তার রেসপন্সিবিলিটি আমার।” আবার তিনি এও বলেন, “যখন সিপিএম জামানা বদলালো, তখন আমার ভূমিকা ছিল। তৃণমূল আসার পর একের পর এক গণ্ডগোল হয়েছে, তখনও আমার ভূমিকা ছিল। আজ নতুন সরকার এসেছে, এখনও আমি ধারাবাহিকভাবে আমার শিল্পকর্মের মধ্যে দিয়ে বলে গেছি।” তাঁর দাবি, তাঁর লেখা, বক্তব্য এবং মতামত সবই নথিভুক্ত রয়েছে এবং প্রয়োজনে যে কেউ তা যাচাই করতে পারবেন। একইসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, সমাজকে বদলাতে হলে কেবল অন্যকে দোষারোপ নয়, প্রত্যেক মানুষের নিজের ভেতরেও আত্মসমালোচনার সাহস থাকা প্রয়োজন। সেই কারণেই তাঁর মতে, প্রকৃত পরিবর্তনের শুরুটা হওয়া উচিত নিজের ভিতর থেকেই।

You cannot copy content of this page