বাংলা টেলিভিশনের পরিচিত মুখ কাঞ্চনা মৈত্র। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য ধারাবাহিক ও সিনেমায় পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেও নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। নায়িকার চরিত্রে না থেকেও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠাই যেন তাঁর পরিচয়। ‘যমুনা ঢাকি’, ‘ঝুমকো’, ‘খুকুমণি হোম ডেলিভারি’ থেকে শুরু করে একাধিক জনপ্রিয় ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। অভিনয়ের পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বরাবরই খোলামেলা কাঞ্চনা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জীবনের নানা অজানা অধ্যায়, সংগ্রাম, প্রেম, বিচ্ছেদ, ইন্ডাস্ট্রির কঠিন বাস্তব এবং সাফল্যের পথ নিয়ে অকপটে কথা বলেছেন।
সাক্ষাৎকারে কাঞ্চনা জানান, ছোটবেলায় তাঁর জীবন ছিল একেবারে রাজকন্যার মতো। বাবা কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থায় উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু বাবার স্বেচ্ছাবসর নেওয়ার পর ধীরে ধীরে সংসারের আর্থিক পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। তিনি বলেন, অভাব শুধু অর্থের নয়, সম্মান হারানোর কষ্টও তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। একসময় তাঁদের বাড়ির আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে পরিবারের গয়নাগাটিও বিক্রি করতে হয়। সেই কঠিন সময়ে অনেক আত্মীয়-পরিজনের আসল মুখও তিনি দেখেছেন। তবে এই পরিস্থিতিই তাঁকে মানসিকভাবে আরও শক্ত করে তোলে। খুব অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিলেন, নিজের পরিচয় নিজেকেই তৈরি করতে হবে।
অভিনয়ে আসার গল্পও ছিল বেশ আলাদা। কলেজ জীবনে একটি বিউটি কনটেস্টে অংশ নিলেও কোনও পুরস্কার পাননি। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক কোরিওগ্রাফারের নজরে পড়ে যান তিনি। এরপর মডেলিংয়ের সুযোগ আসে এবং সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বিনোদন জগতে প্রবেশ। কাঞ্চনা জানান, কেরিয়ারের শুরুতে নায়িকার বোন, বান্ধবী বা ছোটখাটো চরিত্রের অনেক প্রস্তাব এলেও তিনি সব কাজ গ্রহণ করেননি। শর্টকাটে সাফল্য নয়, ধৈর্য ধরে নিজের যোগ্যতায় এগোনোর পথই বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, তিনি কখনও কাস্টিং কাউচ বা অন্য কোনও আপসের রাস্তা বেছে নেননি। বরং বিশ্বাস রেখেছিলেন, একদিন না একদিন ভালো কাজের সুযোগ আসবেই। সেই বিশ্বাসই তাঁকে আজকের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গে কাঞ্চনা জানান, তরুণ বয়সে এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট পড়ুয়ার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। দুই পরিবারের মধ্যেও বিয়ের আলোচনা এগিয়েছিল। কিন্তু বিয়ের ঠিক আগে হঠাৎ করেই সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। তাঁর দাবি, ছেলেটি নিজের কেরিয়ারে বড় সাফল্য পাওয়ার পর সম্পর্ক থেকে সরে আসে। এই বিচ্ছেদ তাঁকে ভীষণভাবে ভেঙে দিয়েছিল। বাস্তবকে মেনে নিতে তাঁর অনেক বছর সময় লেগেছিল। তবে আজ সেই ঘটনার দিকে ফিরে তাকিয়ে তাঁর কোনও আক্ষেপ নেই। বরং তিনি মনে করেন, সেই বিচ্ছেদই তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে। বর্তমানে যদি সেই প্রাক্তনের সঙ্গে দেখা হয়, তবে তাঁকে ধন্যবাদই জানাবেন বলে জানান অভিনেত্রী। কারণ তাঁর মতে, জীবনের সেই অধ্যায় না থাকলে আজকের কাঞ্চনা মৈত্র হয়ে ওঠা হয়তো সম্ভব হতো না।
ইন্ডাস্ট্রির বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাও অকপটে তুলে ধরেছেন অভিনেত্রী। কেরিয়ারের শুরুর দিকে একজন বড় প্রযোজকের কাছ থেকে কাজের প্রস্তাব পেলেও তার বিনিময়ে আপসের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। সেই প্রস্তাব তিনি সোজাসুজি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কাঞ্চনার কথায়, ইন্ডাস্ট্রিতে সম্মান কেউ হাতে তুলে দেয় না, সেটা নিজের কাজের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। তিনি নতুন শিল্পীদেরও একই পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, শুরুতেই চেয়ার, মেকআপ ভ্যান বা বিশেষ সুবিধা দাবি না করে এমনভাবে নিজেকে তৈরি করতে হবে, যাতে প্রযোজনা সংস্থা নিজে থেকেই সেই সম্মান দিতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি তিনি বলেন, ছোট-বড় কোনও কাজকেই কখনও হালকাভাবে দেখা উচিত নয়। একজন প্রকৃত শিল্পীর কাছে প্রতিটি কাজই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ “ইমতিয়াজ আলীর গলায় গয়না, হাতে ট্যাটু দেখতে তো খুব ভালো লাগে, তখন তো তাঁকে হিজ’ড়ে মনে হয় না!” “অমর্ত্য অনেকের থেকে অনেক বেশি শিক্ষিত!” ছেলেকে নিয়ে কটা’ক্ষে বি*স্ফোরক চৈতি ঘোষাল, প্রশংসায় ভরালেন ছেলেকে!
বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ক, কাজ এবং জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও নিজের মতামত জানিয়েছেন কাঞ্চনা। তাঁর মতে, আজকের তরুণ-তরুণীরা অনেক বেশি বাস্তববাদী এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন। বিশেষ করে মেয়েরা এখন নিজের কেরিয়ার, আর্থিক স্বাধীনতা এবং আত্মসম্মানকে অগ্রাধিকার দিতে শিখেছে। প্রেম বা বিচ্ছেদকে জীবনের শেষ কথা হিসেবে না দেখে নতুনভাবে শুরু করার মানসিকতাও বেড়েছে। নিজের জীবন থেকেই শিক্ষা নিয়ে কাঞ্চনা বলেন, কোনও মেয়ের জীবনে কেউ এসে তাকে উদ্ধার করবে এই ধারণা ভুল। নিজের লড়াই নিজেকেই লড়তে হয়। আর সেই কারণেই জীবনের প্রতিটি ব্যর্থতা, অপমান কিংবা বিচ্ছেদকে তিনি আজ নতুনভাবে দেখেন। তাঁর বিশ্বাস, কঠিন সময় মানুষকে ভেঙে দেয় না, বরং আরও শক্তিশালী করে গড়ে তোলে।






