যাঁর মুখ সবাই চেনে, নাম জানে না কেউ! ২০০-র বেশি ছবিতে অভিনয়, অথচ শেষ জীবন কাটছে চরম দুর্দশা ও অভাবে! এবার ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি ২০২৬’-এ সম্মানিত হলেন নিমাই ঘোষ, কিন্তু শুধু পুরস্কার দিলেই কি শিল্পীর প্রতি দায়িত্ব শেষ? একটি স্মারক কি সব ঋণ শোধ করতে পারে? বরং পাশে দাঁড়িয়ে ক’ষ্ট লাঘব করাই হোক আসল শ্রদ্ধাঞ্জলি!

বাংলা সিনেমার এমন অনেক শিল্পী আছেন, যাঁদের মুখ দর্শকের খুব পরিচিত হলেও নামটা খুব কম মানুষই জানেন। তাঁদেরই একজন বর্ষীয়ান অভিনেতা ‘নিমাই ঘোষ’ (Nimai Ghosh)। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দুই শতাধিক সিনেমা ও ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। কখনও বৃদ্ধ, কখনও মাতাল, কখনও গ্রামের সাধারণ মানুষ, আবার কখনও ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছে। ক্যারেক্টার আর্টিস্ট হিসেবে তাঁর অবদান বাংলা চলচ্চিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি কোনওদিনই আসেননি। আজও অনেকেই তাঁর নাম শুনে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার নিমাই ঘোষের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন।

অথচ বাংলা সিনেমার ইতিহাসে নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নিঃশব্দে এক অমূল্য অবদান রেখে গিয়েছেন। তরুণ বয়সে দাক্ষিণেশ্বরের কাছে একটি স্টুডিওতে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘সাঁঝের প্রদীপ’ ছবির শুটিং দেখেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়। তারপর টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় দিনের পর দিন কাজের খোঁজে ঘুরেছেন তিনি। প্রথমে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলেও সেই ছবি আর মুক্তি পায়নি। এরপর থিয়েটারে যোগ দিয়ে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন এবং শিশির ভাদুড়ির হাত ধরে অভিনয়ের ভিত আরও মজবুত করেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বড় পর্দায় নিজের জায়গা তৈরি করেন নিমাই ঘোষ।

দীর্ঘ সংগ্রামের পর তিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম ব্যস্ত ক্যারেক্টার আর্টিস্ট হয়ে ওঠেন, যদিও সেই পরিচিতি কখনও তাঁর প্রাপ্য সম্মানে পৌঁছয়নি। ‘দামু’, ‘চোখ’, ‘পাতালঘর’, ‘স্পন্দন’, ‘কাঁটাতার’, ‘চার’, ‘পিস হেভেন’, ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’, ‘বব বিশ্বাস’ এবং ‘তীরন্দাজ শবর’-এর মতো বহু ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকের নজর কেড়েছে। মৃণাল সেন, বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপ রায়ের মতো পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি ওম পুরীর মতো অভিনেতার সঙ্গেও অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘জন্মভূমি’ থেকে শুরু করে ওয়েব সিরিজ ‘একটি বাঙালি ভূতের গপ্পো’ পর্যন্ত তাঁর অভিনয়যাত্রা বিস্তৃত।

এত কাজ করার পরেও তিনি কখনও তারকাখ্যাতি পাননি। দর্শক তাঁর চরিত্রগুলো মনে রেখেছেন, কিন্তু অভিনেতা নিমাই ঘোষকে চিনে ওঠেননি। আজ জীবনের শেষ পর্বে এসে সেই মানুষটিকেই কাটাতে হচ্ছে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে। সরকারি আবাসনের একটি ছোট, আলো-বাতাসহীন ঘরেই দিন কাটছে তাঁর। কাজের সুযোগ আগের তুলনায় অনেক কমে গিয়েছে, নিয়মিত আয়েরও কোনও নিশ্চয়তা নেই। কখনও কখনও ঠিকমতো খাবার জোটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। একসময় যিনি বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, আজ তিনিই প্রায় বিস্মৃত। বাংলা সিনেমার অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রের নেপথ্যের এই শিল্পীর জীবনসংগ্রাম আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তব তুলে ধরে।

আরও পড়ুনঃ ‘একাকীত্ব জিনিসটা খুব জরুরি, তবেই…’ কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রায় তিন দশকের সুখী দাম্পত্য জীবনে নিজের কোন অভিজ্ঞতা থেকে এই বড় বার্তা চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের?

যেখানে অবদান থাকে, কিন্তু প্রাপ্য স্বীকৃতি এবং নিরাপত্তা অনেক সময় অধরাই থেকে যায়। এই আবহেই ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার আর্টিস্টস’ ফোরামের উদ্যোগে রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি ২০২৬’ অনুষ্ঠানে বর্ষীয়ান শিল্পী নিমাই ঘোষকে সম্মান জানানো হয়। একই মঞ্চে সম্মানিত হন অনেকেই। অনুষ্ঠানে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় নিজে প্রবীণ শিল্পীদের যত্ন করে মঞ্চে নিয়ে যান এবং বলেন, তাঁদের কাজ দেখেই নতুন প্রজন্ম বড় হয়েছে, তাঁদের সংগ্রামই আজকের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা। কিন্তু এখানেই একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, সম্মান জানানো আর দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যে তো স্পষ্ট পার্থক্য আছে। শুধুমাত্র একটি সম্মাননা দিয়ে কি নিমাই ঘোষের মতো একজন শিল্পীর আজীবনের অবদানের মূল্য চুকিয়ে দেওয়া যায়? নাকি শেষ বয়সে তাঁর পাশে দাঁড়ানো, তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত একজন প্রকৃত শিল্পীর প্রতি আমাদের আসল স্বীকৃতি?

You cannot copy content of this page