“আমি বাঁচব কী করে?” আচমকাই এমন প্রশ্ন কেন তুললেন কিংবদন্তি গায়িকা হৈমন্তী শুক্লা? জীবনের এই পর্যায়ে এসে কে হয়ে উঠেছে তাঁর নিত্যদিনের সবচেয়ে বড় সঙ্গী, যাকে ছাড়া বাঁচা অসম্ভব? নিজেই ফাঁস করলেন তিনি!

বাংলা গানের জগতে কয়েক দশক ধরে সমান মর্যাদা ও ভালোবাসা নিয়ে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন কিংবদন্তি গায়িকা হৈমন্তী শুক্লা। রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক গান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তবে শুধু গান নয়, তাঁর বিনয়ী স্বভাব, স্পষ্ট বক্তব্য এবং নতুন প্রজন্মকে আপন করে নেওয়ার মানসিকতাও তাঁকে শ্রোতাদের কাছে আরও প্রিয় করে তুলেছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান সময়ের বাংলা গান, নতুন প্রজন্মের শিল্পী এবং নিজের জীবনদর্শন নিয়ে অকপটে কথা বলতে শোনা গেল এই বর্ষীয়ান শিল্পীকে। তাঁর কথায় উঠে এসেছে শিল্পের প্রতি সম্মান, নতুনদের প্রতি ভালোবাসা এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার এক সুন্দর বার্তা।

গানের মঞ্চে যেমন তিনি নিজের কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতাদের মন জয় করেছেন, তেমনই ব্যক্তিগত জীবনেও সহজ-সরল ব্যবহার দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। দীর্ঘ শিল্পীজীবনে তিনি একাধিক প্রজন্মের গায়ক-গায়িকা ও শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। অথচ কখনও নিজের সিনিয়রিটির অহংকার দেখাননি। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্পের জগতে পারস্পরিক সম্মান এবং ভাবের আদান-প্রদানই একজন শিল্পীকে আরও সমৃদ্ধ করে। তাই নতুনদের সঙ্গে মিশতে বা তাঁদের কাজকে মূল্য দিতে তাঁর কোনও দ্বিধা নেই। এই মনোভাবই তাঁকে আজও প্রাসঙ্গিক এবং শ্রদ্ধেয় করে রেখেছে।

সাক্ষাৎকারে বর্তমান প্রজন্মের গান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হৈমন্তী শুক্লা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি আজকের গায়ক-গায়িকাদের গানকে যথেষ্ট সম্মান করেন। শুধু প্রশংসার জন্য প্রশংসা করেন না, বরং সত্যিই ভালো লাগলে সেটি প্রকাশ করেন। এই প্রসঙ্গেই তিনি জনপ্রিয় শিল্পী সোমলতার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, সোমলতা রবীন্দ্রসংগীতকে নিজের স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে নতুন মাত্রা দিয়েছেন, যা তাঁর খুবই ভালো লাগে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা নিজেদের মতো করে গানকে উপস্থাপন করছেন, সেই প্রচেষ্টাকে তিনি ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখেন। একই সঙ্গে তিনি এটাও জানান, কোনও গান বা পরিবেশনা তাঁর ভালো না লাগলে সেটিও তিনি সরাসরি বলতে পারেন। কারণ তাঁর কাছে সততাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই আলোচনায় নচিকেতার প্রসঙ্গও উঠে আসে। হৈমন্তী শুক্লা জানান, তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে কে কাকে পছন্দ করেন, তা তিনি জানেন না। তবে নচিকেতার গানের ধরন তাঁর ব্যক্তিগতভাবে খুবই ভালো লাগে। পাশাপাশি তিনি বলেন, জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি দুই থেকে তিন প্রজন্মের গায়ক-গায়িকাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাই শুধুমাত্র তিনি সিনিয়র বলেই অন্যদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখবেন বা তাঁদের গুরুত্ব কম দেবেন, এমন মানসিকতায় তিনি বিশ্বাসী নন। বরং সবার সঙ্গে ভাব বিনিময় করে, একসঙ্গে কাজ করেই তিনি আনন্দ পান। তাঁর মতে, একজন শিল্পীর শেখার কোনও শেষ নেই এবং নতুনদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শেখা যায়।

আরও পড়ুনঃ “আমি সেদিন পা ছড়িয়ে বসে কাঁদতে কাঁদতে ভেবেছিলাম…” “লোডশেডিং হলে খাট থেকে পা নামাতেও ভয় পেতাম, যদি…” স্বামীর মৃ’ত্যুর পর ভেঙে পড়া থেকে নতুন করে বাঁচার লড়াই! শোককে শক্তিতে বদলে, কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন মালবিকা সেন? চোখ ভেজানো অধ্যায়ের স্মৃতি ভাগ করলেন অভিনেত্রী!

বর্তমান সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার বিষয়েও নিজের মতামত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাঁর কথায়, “আমি যদি টেলিফোন চালানো না শিখি, আমি যদি ফেসবুক না দেখি, সমাজমাধ্যম ব্যবহার করা না শিখি, তাহলে আমি বাঁচব কী করে?” তিনি জানান, বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, নতুন গান, সামাজিক মাধ্যমের নানা বিষয় নিয়মিত অনুসরণ করেন। কারণ এটাই এখন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। প্রযুক্তিকে দূরে সরিয়ে না রেখে, তাকে জীবনের অংশ করে নেওয়ার মধ্যেই তিনি ভবিষ্যতের পথ দেখেন। তাঁর এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে, প্রকৃত শিল্পী কখনও শুধু নিজের সময়ে আটকে থাকেন না, বরং প্রতিটি নতুন সময়কে আপন করে নিয়েই দীর্ঘদিন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন।

You cannot copy content of this page