বাঙালি গায়ক ‘শিলাজিৎ মজুমদার’ (Silajit Majumder) বরাবরই নিজের শর্তে চলতে অভ্যস্ত। গান, অভিনয় কিংবা অন্য যে কোনও সৃজনশীল কাজ, সব জায়গাতেই তিনি নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এই আত্মবিশ্বাস, যা তাঁকে কোনও পরিস্থিতিতেই ভেঙে পড়তে দেয় না। কাজ হারানোর ভয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই তিনি একেবারে নির্ভার গলায় বলেন, “আমি আমার ক্ষমতা দিয়ে করে নেব। কারণ, অভিনয়, গান ছাড়াও আরও অনেক কিছু করার ক্ষমতা আছে আমার। আমি ম্যাসাজকে পেশা করেও বেঁচে থাকতে পারি। আমি কথা বলতে পারি, ফলে রেডিয়ো জকিও হয়ে যেতে পারি। আবার আমি সেল্সম্যানও হতে পারি। আমার অতটা নিরাপত্তাহীনতা নেই।” তাঁর এই বক্তব্যেই স্পষ্ট, কোনও বিশেষ পেশা বা পরিচয়ের উপর নির্ভর করে তিনি নিজের অস্তিত্বকে বিচার করেন না। বরং নিজের দক্ষতার উপর ভরসা রাখেন, আর সেই কারণেই তিনি বিশ্বাস করেন, যে কোনও পরিস্থিতিতে নিজের মতো করে পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব।
সম্প্রতি সমর্পণ সেনগুপ্ত পরিচালিত ‘প্রত্যাবর্তন’ ছবিতে তাঁর অভিনয় নতুন করে দর্শকদের নজর কেড়েছে। ছবিটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রেক্ষাগৃহে চলেছে, যা নতুন পরিচালক ও নতুন প্রযোজনা সংস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। তবে এই প্রশংসাকে তিনি নিজের অভিনয়জীবনের একেবারে নতুন সূচনা বলতে রাজি নন। তাঁর কথায়, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে তিনি এমন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করেছে। ‘সঙ্গী’, ‘অসুখ’-এর মতো ছবিতে যেমন ভিন্নধর্মী চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে, তেমনই হরনাথ চক্রবর্তী, ঋতুপর্ণ ঘোষ বা শেখর দাসের মতো সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের পরিচালকদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, তিনি খুব বেশি ছবি করেন না, কিন্তু যেসব চরিত্র তাঁর কাছে এসেছে, সেগুলোর জন্য অনেক অভিনেতাই অপেক্ষা করে থাকেন।
তাই যদি এই সাফল্যকে কেউ তাঁর ‘প্রত্যাবর্তন’ বলেন, তাতে তাঁর আপত্তি নেই। বরং মজার ছলেই জানিয়ে দেন, আবার হয়তো দু’বছর পর নতুন কোনও ছবিতে দেখা যাবে তাঁকে। সিনেমার কাজের পরিবেশ নিয়েও শিলাজিতের বক্তব্য যথেষ্ট স্পষ্ট। অভিনেতা রাহুলের মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি বলেন, নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয় নিয়েও শিল্পীদের অনেক সময় অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে, শুটিংয়ের সময় কোনও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বা সুবিধার কথা তুললেই অনেক প্রযোজক সেটাকে অহঙ্কার বা অযৌক্তিক দাবি বলে মনে করেন। তাই তাঁর বিশ্বাস, “রাহুল যদি ওখানে নিরাপত্তার জন্য কিছু জিনিস চাইত, ও হয়তো পেত না, ওকে দেওয়া হতো না বলেই আমার বিশ্বাস।”
এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথা বলেননি, বরং গোটা ইন্ডাস্ট্রির কাজের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শিল্পীদের নিরাপত্তাকে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হিসেবে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি। রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও নিজের মতামত গোপন করেননি শিলাজিৎ। সরকার বদলের পরে তিনি আশাবাদী বলেই জানিয়েছেন, যদিও সেই আশার সঙ্গে বাস্তবের হিসেবও জুড়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন সরকারের উপর মানুষ ভরসা রেখেছে, তাই এবারও তিনি অপেক্ষা করছেন কাজের ফল দেখার জন্য। তিনি বলেন, “আমি অনেকটাই আশাবাদী। ৩৪ বছর আশা করেছিলাম। ১৫ বছর আশা করেছিলাম। এ বার নিশ্চয়ই আশা করার সময়টা কমবে।”
তাঁর মতে, এখনও খুব অল্প সময় হয়েছে, তাই চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় আসেনি। তবে সরকারের কয়েকটি পদক্ষেপ দেখে তাঁর মনে হয়েছে, কিছু সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যদিও তিনি এটাও স্পষ্ট করে দেন, তাঁর ব্যক্তিগত কোনও প্রত্যাশা বা সুবিধা পাওয়ার ইচ্ছা নেই। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তিনি শুধু কাজ দেখতে চান। সমাজের যে বিষয়গুলো তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়, তার মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা অন্যতম। বিশেষ করে সরকারি স্কুলগুলোর অবস্থা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই সন্তানদের দিকে নজর রাখতে পারেন এবং বেসরকারি স্কুলে পড়ানোর সুযোগ পান। কিন্তু গ্রামের সরকারি স্কুলগুলোর বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি চান, নতুন সরকার প্রথমেই দরিদ্র মানুষের শিক্ষা ও জীবনযাত্রার উন্নতির দিকে নজর দিক। পাশাপাশি দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দিনমজুরদের ন্যায্য পারিশ্রমিক বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও রেখেছেন, সন্তান জন্মের সময় ধর্ম বা জাত নির্বিশেষে প্রত্যেক প্রসূতি যেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব পান। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, জননেতারা যদি সত্যিই সরকারি পরিষেবার মান উন্নত করতে চান, তাহলে তাঁদের নিজেদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে পড়ানো এবং পরিবারের চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালেই করানো উচিত। তাহলেই সেই ব্যবস্থার উন্নতির প্রতি বাস্তব দায়বদ্ধতা তৈরি হবে।
আরও পড়ুনঃ “আমার ৩১ বছর ইন্ডাস্ট্রিতে, বাম শাসন দেখেছি, তৃণমূল দেখেছি, এখন বিজেপিও দেখছি…টমেটো নই, আমি আলু, পেঁয়াজ” সরকার বদলের পর রচনা থেকে হিরণ, একাধিক টলিউড বিতর্কে স্পষ্ট বার্তা ভরত কলের!
মানুষ হিসেবে শিলাজিৎ বরাবরই কিছুটা আলাদা। সাধারণ জীবনযাপন, মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা, নিজের মতো করে কাজ বেছে নেওয়া, এসবই তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ। তিনি কখনও জনপ্রিয়তার চাপে নিজের অবস্থান বদলাতে চাননি। বরং যেটা বিশ্বাস করেন, সেটাই স্পষ্টভাবে বলতে পছন্দ করেন। তাঁর সাম্প্রতিক অভিনয় যেমন দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনই এই সাক্ষাৎকারেও উঠে এসেছে একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত সততা, সমাজ নিয়ে ভাবনা, কাজের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ এবং নিজের সক্ষমতার উপর অটুট বিশ্বাস। সব মিলিয়ে শিলাজিতের কথায় যেমন একজন অভিনেতার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তেমনই রয়েছে একজন সাধারণ নাগরিকের প্রত্যাশা, যিনি মনে করেন পরিবর্তনের কথা বলার পাশাপাশি নিজের অবস্থানেও সৎ থাকা জরুরি।






