বাংলা থিয়েটার জগতের অন্যতম পরিচিত মুখ চন্দন সেন। অভিনেতা, নির্দেশক ও নাট্যকার হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতি নিয়েও বরাবরই সরব তিনি। বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী হলেও কোনও রাজনৈতিক দলকে অন্ধভাবে সমর্থন করার পক্ষপাতী নন বলে একাধিকবার জানিয়েছেন। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে উপস্থিত হয়ে তিনি নিজের রাজনৈতিক দর্শন, গণনাট্য আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতির উপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন। সাক্ষাৎকারে চন্দন সেন বারবার পরিবর্তনের রাজনীতির কথা তুলে ধরেন। নিউটনের তৃতীয় সূত্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।”
তাঁর মতে, কোনও রাজনৈতিক শক্তি বা মতাদর্শ দীর্ঘ সময় ধরে একই অবস্থায় থাকতে পারে না। মানুষের চাহিদা, সমাজের বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলায়, ফলে ক্ষমতার সমীকরণও পরিবর্তিত হয়। “ডিম খুব অচিরেই পাথরে পরিণত হবে” মন্তব্যের মধ্যেও তিনি সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিতই দিয়েছেন। অর্থাৎ, আজ যা দুর্বল বা অপরিণত বলে মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেটাই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। আবার ক্ষমতাশালী শক্তিও সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন, যেখানে কোনও অবস্থাই স্থায়ী নয়। গণনাট্য সংঘ, বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে শিল্পীদের সম্পর্ক নিয়েও সরব হন চন্দন সেন।
তাঁর অভিযোগ, একসময় শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে মতবিনিময় এবং বিতর্কের জায়গা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পীদের স্বাধীনতা রাজনৈতিক নির্দেশের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, “পার্টি মানে পলিটিক্স কমান্ডস এই ধারণাটা এমনভাবে প্রয়োগ হয়েছে যে শিল্পীদের অনেক সময় শুধুই প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।” তাঁর মতে, কোনও রাজনৈতিক দলের তাৎক্ষণিক কৌশল অনুযায়ী সাহিত্য, নাটক বা সংস্কৃতিকে পরিচালিত করা উচিত নয়। কারণ শিল্পের নিজস্ব ভাষা ও স্বাধীনতা রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “আজ একটি নাটকে কোনও নীতির সমালোচনা করলাম, কাল রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেলে কি সেই নাটক বন্ধ করে দিতে হবে?” এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই তিনি শিল্পের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের পক্ষে সওয়াল করেন।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট বার্তা দেন অভিনেতা। তিনি জানান, মতাদর্শে বিশ্বাসী হওয়া এবং কোনও দলের নিঃশর্ত অনুসারী হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। চন্দন সেনের মতে, একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি হল স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা। তাই তিনি বলেন, “আমি কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য জীবনে কোনওদিন হব না। কোনও দলের সক্রিয় সমর্থক থাকতে পারি, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার নিজস্ব মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকবে।” তাঁর কথায়, কোনও সংগঠন বা রাজনৈতিক দল যদি সমালোচনা সহ্য করতে না পারে, তাহলে সেখানে সৃজনশীল মানুষের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। তিনি মনে করেন, মতের অমিল থাকলেও আলোচনা এবং তর্কের পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুনঃ “যারা আমাদের ‘গদ্দার’ বলছেন, তারা আসলে এক একটা চোরদের…” “আমি একজন সেলিব্রিটি মুখ, আজ থেকে নতুন যাত্রা শুরু…” দিল্লির সংসদে পা দিয়েই প্রাক্তন দলকে কী কড়া হুঁশিয়ারি ছুঁড়লেন রচনা বন্দোপাধ্যায়? নিজের জয় নিয়েও ফের বি*স্ফোরক দাবি এনসিপিআই সাংসদের?
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে ‘বুদ্ধিজীবী’ পরিচয় এবং বর্তমান সমাজে আলোচনার সংস্কৃতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন চন্দন সেন। তাঁর মতে, শুধুমাত্র বই পড়া বা রাজনৈতিক বক্তব্য রাখলেই কেউ বুদ্ধিজীবী হয়ে যায় না। বরং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ এবং ভিন্ন মতকে শোনার মানসিকতাই একজন মানুষকে সমৃদ্ধ করে। উৎপল দত্ত, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রকৃত জ্ঞানীরা কখনও শেখা বন্ধ করেন না। বর্তমান সময়ে সেই মুক্ত আলোচনা এবং বৌদ্ধিক বিতর্কের পরিসর কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর কথায়, “ডিসকোর্স থেকে সরে যাওয়া একটা জাতির পক্ষে সাংঘাতিক।” তাই রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সমাজ সব ক্ষেত্রেই মুক্ত চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করা জরুরি বলেই মনে করেন চন্দন সেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে একটাই বার্তা পরিবর্তন অনিবার্য, কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভিত হওয়া উচিত যুক্তি, আলোচনা এবং স্বাধীন চিন্তা।






