অভিনেতা উজান গাঙ্গুলী বরাবরই নিজের কাজ এবং ব্যক্তিগত মতাদর্শের মাধ্যমে সমাজের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলী ও অভিনেত্রী চূর্ণী গাঙ্গুলীর ছেলে হওয়ার পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তিনি নিজের শিল্পচর্চার মাধ্যমেই দর্শকদের কাছে পৌঁছতে চান। সম্প্রতি নিজের নতুন ছবি নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি শুধু সিনেমার কথা বলেননি, বরং মানসিক স্বাস্থ্য, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, প্রতিবাদের ভাষা এবং শিশুদের নিরাপত্তার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খোলাখুলি মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁর কথায়, একজন শিল্পীরও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই তিনি নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে চান।
প্রতিবাদ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উজান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে তিনি প্রতিবাদে বিশ্বাস করেন, তবে প্রতিবাদের ভাষা সবার এক হওয়া জরুরি নয়। তাঁর কথায়, “আমার প্রতিবাদের অনেক ভাষা আছে। আমি যেই মাধ্যমটা ব্যবহার করতে চাই, সেটা আমার শিল্প হতে পারে।” তিনি জানান, অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ করেন, রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন, আবার কেউ নিজের কাজের মাধ্যমেও প্রতিবাদ করেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, শিল্পই তাঁর প্রতিবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। উজান বলেন, “আমি আমার শিল্পের মাধ্যমে আমার বক্তব্য রাখার চেষ্টা করি। বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করি। মানবিকতার জায়গা থেকে যদি কারও ক্ষতি বা কষ্ট হয়, সেটার বিরুদ্ধে আমি সবসময়ই দাঁড়াতে চাই।”
তাঁর মতে, প্রতিবাদ কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানবিকতার প্রশ্নে প্রতিবাদ হওয়া উচিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ বা ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের বিষয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন অভিনেতা। তিনি বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত দুঃখ বা মতামত শেয়ার করার পর যে ধরনের মন্তব্য দেখতে পাই, তাতে রুচির অভাব এবং সংবেদনশীলতার অভাব স্পষ্ট বোঝা যায়।” সেই কারণেই তিনি সোশ্যাল মিডিয়াকে নিজের প্রধান প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে দেখতে চান না। তাঁর বিশ্বাস, একজন শিল্পীর কাজই তাঁর সবচেয়ে বড় বক্তব্য হতে পারে। তিনি আরও বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে সমাজমাধ্যমের প্রতি খুব একটা আকৃষ্ট নই। বরং আমার শিল্পের মাধ্যমেই আমি আমার বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।”
তাঁর মতে, প্রতিবাদকে কখনওই শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট বা হ্যাশট্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। মানসিক স্বাস্থ্য এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উজান বলেন, “যারা বলে আমার থেরাপির দরকার নেই, তাদেরও দরকার থাকে। এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজেরই ফল, যেখানে ছেলেদের শেখানো হয় তারা দুর্বল হতে পারে না।” তিনি মনে করেন, নিজের মানসিক সমস্যার কথা স্বীকার করাটাও এক ধরনের সাহস। একইসঙ্গে তিনি বলেন, পুরুষত্বের সংজ্ঞা সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে সংবেদনশীল হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলা থেকেই ছেলে-মেয়েদের মানবিক শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুনঃ “একজন মালিও এর থেকে ভালো উত্তর দিত, শতবর্ষী গাছের বিকল্প কখনও…” নজিরবিহীন কটাক্ষ! ‘সবজান্তা’ চিকিৎসককে প্রকাশ্যে ধুয়ে দিলেন অরিজিৎ সিং! দিল্লির ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে ফের গায়কের বি*স্ফোরক মন্তব্যে নতুন বিতর্ক! পাল্টা যুক্তিতে সমালোচকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে ছুঁড়লেন কী চ্যালেঞ্জ?
সবশেষে শিশুদের নিরাপত্তা এবং যৌন নির্যাতনের মতো বিষয় নিয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় নিজের মত প্রকাশ করেন উজান গাঙ্গুলী। তিনি বলেন, “ব্যাড টাচ আমি ঘৃণা করি, সারাজীবন করে যাব। যারা এই ধরনের অপরাধ করে, তারা ইন্ডাস্ট্রির হোক বা বাইরের মানুষ হোক, তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।” তাঁর মতে, সমাজকে পরিবর্তন করতে হলে শুধুমাত্র আইন বা রাজনীতি নয়, মানুষের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। শিল্প, মানবিকতা এবং সংবেদনশীলতার মাধ্যমে সমাজের অসংগতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। অভিনেতার এই অকপট বক্তব্য ফের একবার প্রমাণ করল, একজন শিল্পীর কাজ শুধু পর্দায় অভিনয় করা নয়, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়েও মানুষকে ভাবতে বাধ্য করাও তাঁর অন্যতম দায়িত্ব।






