“বাংলা ব্যাকরণ সম্পর্কে ওদের ধারণাই নেই, নামের শেষে দীর্ঘ ‘ঈ’ থাকলেই স্ত্রীলিঙ্গ, নিজেকে পৌরুষ প্রমাণ করার চেষ্টায়…” কাদের শিক্ষার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বি*স্ফোরক আবির চট্টোপাধ্যায়ের বাবা, ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়? আজও তাঁকে বলা হয় ‘অভিনেত্রী’, অত্যন্ত বিরক্ত বর্ষীয়ান অভিনেতা? কার ভুলে বছরের পর বছর ধরে ছড়াচ্ছে এই বিভ্রান্তি?

বিনোদনের ঝলমলে দুনিয়া যতটা রঙিন, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে শিল্পীদের জীবনের বহু না বলা গল্প, দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং শিল্পচর্চার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। দর্শকের কাছে একজন অভিনেতার পরিচয় তাঁর অভিনীত চরিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, সেই চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার পিছনে থাকে বছরের পর বছর সাধনা, পড়াশোনা এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত তৈরি করে চলার লড়াই। বর্তমান সময়ে যখন জনপ্রিয়তার সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে, তখনও কিছু শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা শিল্পকেই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন। তেমনই একজন বর্ষীয়ান অভিনেতা ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়, যিনি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয় জীবন, থিয়েটার, বাংলা সিনেমা, নতুন প্রজন্মের শিল্পী এবং বর্তমান বিনোদন মাধ্যম নিয়ে অকপটে কথা বলেছেন।

বাংলা থিয়েটার, টেলিভিশন এবং সিনেমা জগতের অত্যন্ত পরিচিত মুখ ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়। কয়েক দশক ধরে নিজের অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। শুধুমাত্র অভিনেতা হিসেবেই নয়, নাট্যপরিচালক এবং নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর পরিবারও কার্যত অভিনয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্ত্রী অভিনেত্রী রুমকি চট্টোপাধ্যায় এবং ছেলে জনপ্রিয় অভিনেতা আবির চট্টোপাধ্যায় তিন প্রজন্মের শিল্পচর্চার এক উজ্জ্বল উদাহরণ তাঁদের পরিবার। তবে এত সাফল্যের পরেও তাঁর কথায় বারবার উঠে এসেছে বিনয় এবং শিল্পের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। অভিনেতার কথায়, “আমি সংস্কৃতিকে কতটা দিয়েছি জানি না, বরং সংস্কৃতিই আমাকে অনেক বেশি দিয়েছে।”

সাক্ষাৎকারে মজার ছলেই উঠে আসে একটি পুরনো বিতর্কের প্রসঙ্গ। ইন্টারনেটে এখনও অনেক জায়গায় তাঁকে “অভিনেত্রী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, “আমাদের অনেকেরই বাংলা ব্যাকরণ সম্পর্কে ধারণা কম। নামের শেষে দীর্ঘ ‘ঈ’ থাকলেই ধরে নেওয়া হয় স্ত্রীলিঙ্গ হবে। তাই ইন্টারনেটে আমাকে অভিনেত্রী বলা হয়েছে। এতে আমার পৌরুষ প্রমাণ করার কোনও প্রয়োজন আমি কখনও অনুভব করিনি।” শুধু তাই নয়, তিনি জানান, ইন্টারনেটে তাঁর বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজের উল্লেখও নেই। তবে এসব নিয়ে কোনওদিন সংশোধনের উদ্যোগ নেননি তিনি। বরং তাঁর বিশ্বাস, একজন শিল্পীর আসল পরিচয় তাঁর কাজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি নিজেকে সবসময় সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করি। আমি যা পেয়েছি, তার থেকে অনেক বেশি পাওয়ার যোগ্য হয়তো আমি ছিলাম না। তাই আমি আমার থিয়েটার, সিনেমা এবং সংস্কৃতির কাছে কৃতজ্ঞ।”

থিয়েটার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানান, তাঁর “ফার্স্ট লাভ” থিয়েটারই। ছোটবেলায় মাত্র এক টাকার টিকিট কেটে নান্দিকারের নাটক দেখতেন তিনি। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, কেয়া চক্রবর্তী, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তদের অভিনয় দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তাঁর কথায়, “এক টাকা দিয়ে টিকিট কেটে নান্দিকারের নাটক দেখতাম। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে মনে হয়েছিল, এমন একটা জীবন আমিও চাই।” তিনি আরও বলেন, একজন অভিনেতার জন্য বই পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বই মানুষকে চরিত্র নির্মাণ করতে শেখায়। তাঁর মতে, “শুধু সিনেমা দেখে বিনোদিত হলেই হবে না, শিক্ষার্থীর চোখ দিয়ে দেখতে হবে অভিনেতা কীভাবে চরিত্রটিকে তৈরি করলেন।” বর্তমান সময়ে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ায় তিনি খানিকটা আক্ষেপও প্রকাশ করেন।

একইসঙ্গে তথাকথিত “স্বর্ণযুগের অভিনেতাদের” প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “আগে সব ভালো ছিল আর এখন ভালো অভিনেতা নেই, আমি এটা মানি না। এখনও অসাধারণ অভিনেতা-অভিনেত্রী রয়েছেন।” তিনি মনে করেন, নস্টালজিয়া অনেক সময় মানুষকে অন্ধ করে দেয়। উত্তম কুমারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “উত্তম কুমারের প্রথম দিকের অভিনয় এবং পরবর্তী সময়ের অভিনয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য ছিল। তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন। শুধু তাঁকে পূজা করলেই হবে না, তাঁর কাছ থেকে শেখাটাও জরুরি।” বাংলা সিনেমার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জানান, এখনও অত্যন্ত ভালো বাংলা ছবি তৈরি হচ্ছে। তবে দর্শকের রুচি এবং বিনোদনের মাধ্যম বদলে গিয়েছে। তাঁর মতে, সিনেমা হলে বসে বড় পর্দায় সিনেমা দেখার যে অনুভূতি, তা কখনও মোবাইল বা ছোট পর্দায় পাওয়া সম্ভব নয়। “মোবাইলের স্ক্রিনে সিনেমা দেখা মানে সিনেমার আত্মাটাকেই নষ্ট করে দেওয়া,” বলে মন্তব্য করেন বর্ষীয়ান এই অভিনেতা।

আরও পড়ুনঃ “ছিঃ! দেশের প্রধানের এমন অবমাননা অত্যন্ত কুরুচিকর ও নিন্দনীয়… এদের শাস্তি পাওয়াই দরকার!” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিকৃত ছবি প্রদর্শনের অভিযোগে শ্রীলেখার বিরুদ্ধে থানায় বিজেপি নেত্রী কেয়া ঘোষ! ছাত্র আন্দোলন ঘিরে নতুন বিতর্ক, গ্রেফতার হবেন অভিনেত্রী?

নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়। চাকরি ছেড়ে অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে স্ত্রীকে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “কত টাকা হলে সংসার চলবে বল?” সেই পরিমাণ অর্থ নিয়মিত রোজগার করতে পারবেন বলেই তিনি চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস, অভিনয় কোনও পার্ট-টাইম কাজ নয়, এটি সম্পূর্ণ সময়ের পেশা। ছেলে আবির চট্টোপাধ্যায়ের সাফল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চরিত্র বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘না’ বলতে শেখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, আর আবির সেটা পারে।” সব মিলিয়ে, এই সাক্ষাৎকারে ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায় যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন শিল্পের কোনও নির্দিষ্ট সময়কাল হয় না, শিল্পীকে তৈরি করে তাঁর সাধনা, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

You cannot copy content of this page