বিনোদন জগতের আলো-ঝলমলে সাফল্যের পিছনে লুকিয়ে থাকে বহু না বলা গল্প। অনেক শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের অবদান বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকলেও সময়ের সঙ্গে তাঁরা যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গিয়েছেন। অথচ তাঁদের কাজ, শিল্পচর্চা এবং অভিনয় জীবন আজও নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষণীয়। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও বহু শিল্পী সচেতনভাবেই বেছে নিয়েছেন নিজস্ব জীবনযাপন। ঠিক তেমনই এক শিল্পী অলকানন্দা রায়, যাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। কিন্তু আজও যখন টেলিভিশনের ধারাবাহিকে অভিনয়ের প্রস্তাব আসে, তখন কেন বারবার ‘না’ বলে দেন তিনি?
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অত্যন্ত সম্মানিত অভিনেত্রী অলকানন্দা রায়। সত্যজিৎ রায়ের প্রথম রঙিন ছবি ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র অন্যতম মুখ তিনি। শুধু সত্যজিৎ রায় নন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেন, শ্যাম বেনেগাল, শেখর দাস, অঞ্জন দাসের মতো একাধিক প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। সিনেমার পাশাপাশি টেলিফিল্ম এবং টেলিভিশনেও তাঁর কাজ সমানভাবে প্রশংসিত হয়েছে। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে একাধিক সম্মানজনক পুরস্কারও পেয়েছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। তবে এত সাফল্যের পরেও অভিনয় জগতে আসার পিছনে তাঁর নিজের কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না বলেই অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অলকানন্দা রায় জানিয়েছেন, এখনও নিয়মিত তাঁর কাছে ধারাবাহিকে অভিনয়ের প্রস্তাব আসে। এমনকী প্রযোজক-পরিচালকদের অনেকেই তাঁকে বলেন, “কিছু কিছু চরিত্র হাতে পেলেই আপনার কথাই মনে পড়ে, আপনি না করলে কে করবে?” কিন্তু অভিনেত্রীর উত্তর একটাই তিনি আর মেগা সিরিয়াল করতে চান না। তাঁর কথায়, “আমি কাজের মধ্যেই থাকতে চাই, যতদিন পারব কাজ করব। কিন্তু মেগা সিরিয়াল আর করছি না।” কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে দীর্ঘদিন ধরে একটি গল্প টেনে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তাঁকে আকৃষ্ট করে না। ভালো গল্প দিয়েই ধারাবাহিক শুরু হলেও পরে তা অযথা দীর্ঘায়িত হয় বলে তাঁর মত। ফলে দর্শকও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বরং ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের টেলিফিল্মের মতো গল্প বলার মাধ্যমকেই তিনি বেশি উপভোগ করেন।
সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-য় অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার গল্পটিও কম চমকপ্রদ নয়। সেই সময়ে মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের মেয়েদের সিনেমায় অভিনয় করাকে খুব ভালো চোখে দেখা হতো না। অলকানন্দা রায়ের পরিবার আবার বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হলেও পরিবারের মেয়েদের সিনেমা থেকে দূরে রাখার বিষয়টি ছিল অত্যন্ত কঠোর। অভিনেত্রী জানিয়েছেন, তাঁর পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা জীবিত থাকলে তিনি কখনও ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-য় অভিনয় করতে পারতেন না। সত্যজিৎ রায় নিজে তাঁর বাবাকে রাজি করান। পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল একাধিক শর্তও কোথাও ছবি প্রকাশ করা যাবে না, কোনও পার্টিতে ডাকা যাবে না, অন্য পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যাবে না। এতসব শর্ত মেনেই শেষ পর্যন্ত তিনি ছবিতে অভিনয় করেন। তবে সেই সময় তাঁর নিজেরও অভিনেত্রী হওয়ার কোনও স্বপ্ন ছিল না। বিদেশে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ ছিল তাঁর। তিনি অধ্যাপনা করতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন।
আরও পড়ুনঃ শেষবার মহানায়ককে দেখতে এসেছিলেন প্রিয় রমা! স্বামীর ম’রদেহের সামনে দাঁড়িয়েই সুচিত্রা সেনকে কী দায়িত্ব দিয়েছিলেন সদ্য বিধবা গৌরী দেবী? মহানায়িকাকে দিয়ে সেদিন যা করিয়েছিলেন উত্তম পত্নী, সেই মুহূর্ত ঘিরে আজও হয় চর্চা! জানলে, আবেগে ভাসবেন আপনিও!
অভিনয়ের জগতে তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসও শুরু হয়েছিল একেবারে পরিচালকদের অনুরোধে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবিতে অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মান পান। এরপর একের পর এক কাজ করেছেন বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টে। ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘উৎসব’, অপর্ণা সেনের ‘পারমিতার একদিন’, শ্যাম বেনেগালের ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু’-র বায়োপিক কিংবা আন্তর্জাতিক ছবি ‘সিটি অফ জয়’ সব ক্ষেত্রেই তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও আজও তিনি মনে করেন, টেলিভিশনে টেলিফিল্মের যুগ ফিরিয়ে আনা উচিত। তাঁর মতে, বর্তমান প্রজন্মের দর্শকের মনোযোগের সময় অনেক কমে গিয়েছে। তাই ছোট কিন্তু শক্তিশালী গল্পই দর্শকের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। অলকানন্দা রায়ের কথায় স্পষ্ট, অভিনয় তাঁর কাছে কখনও জনপ্রিয়তার মাধ্যম ছিল না, বরং ভালো গল্প এবং ভালো চরিত্রই তাঁকে কাজের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। আর সেই কারণেই আজও যখন কোনও চরিত্র তাঁর কাছে আসে, তিনি প্রথমে খোঁজেন গল্পের গভীরতা, জনপ্রিয়তার নয়।






