যিনি বাংলা থিয়েটার, টেলিভিশন এবং সিনেমার এক পরিচিত ও সম্মানিত মুখ শঙ্কর চক্রবর্তী (Shankar Chakraborty)। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় জগতে কাজ করে চলেছেন তিনি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত, রবি ঘোষ, তরুণ কুমার, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। অভিনয়ের পাশাপাশি এখনও নিয়মিত থিয়েটার করেন তিনি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয় জীবন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, শরীর নিয়ে সমালোচনা থেকে শুরু করে পরিবার এবং মেয়েকে নিয়ে একাধিক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা অকপটে ভাগ করে নিয়েছেন অভিনেতা।
সাক্ষাৎকারের শুরু থেকেই অত্যন্ত খোলামেলা ছিলেন শঙ্কর চক্রবর্তী। তিনি জানিয়েছেন, অভিনয় জীবনে কখনও নিজের চেহারা বা জনপ্রিয়তা নিয়ে বেশি ভাবেননি। বরং ভালো চরিত্রে অভিনয় করাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অভিনয়ের প্রশংসা কিংবদন্তি সাহিত্যিক জয় গোস্বামী থেকে শুরু করে বহু গুণী মানুষের কাছ থেকে পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চার অধ্যায়’-এ তাঁর অভিনয় দেখে জয় গোস্বামী তাঁকে প্রণাম করতে চেয়েছিলেন। আবার ‘শাহজাহান’ নাটকে অভিনয় দেখে বহু মানুষ তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে নিজের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে বরাবরই তিনি বিনয়ী থেকেছেন। তাঁর কথায়, উৎপল দত্ত বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীদের কাজের সমালোচনা করার যোগ্যতাও তাঁর নেই।
অভিনয় জীবনের নানা অভাব-অভিযোগের কথাও অকপটে তুলে ধরেছেন শঙ্কর চক্রবর্তী। তিনি জানান, একসময় তাঁকে বলা হত তিনি খুব মোটা, তাই কিছু চরিত্রে তাঁকে নেওয়া সম্ভব নয়। পরে ওজন কমানোর পর আবার শুনতে হয়েছে তিনি খুব রোগা হয়ে গিয়েছেন। এমনকি সম্প্রতি একটি ওয়েব সিরিজ থেকেও তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে রোগা হওয়ার কারণে। যদিও তাঁর পরিবর্তে যাঁকে নেওয়া হয়েছে, তিনি মোটেও মোটা নন বলেও মন্তব্য করেন অভিনেতা। তাঁর মতে, বর্তমানে বিনোদন জগতে সৌন্দর্যের একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠি তৈরি করা হয়েছে। দর্শককে সেটাই বারবার দেখানো হচ্ছে। ফলে অনেক সময় একজন দক্ষ অভিনেতাও শুধুমাত্র চেহারার কারণে কাজ হারাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, ধারাবাহিকে অভিনয় করতে করতে অনেক অভিনেতার অভিনয়ের ধরন বদলে যায়।
সিনেমা, থিয়েটার এবং ধারাবাহিক প্রতিটি মাধ্যমের অভিনয়ের ভাষা আলাদা। তাই একজন অভিনেতার দক্ষতা বিচার করার ক্ষেত্রেও সেই বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন। শঙ্কর চক্রবর্তী আরও জানান, জীবনের নানা সময়ে আর্থিক কারণেও তাঁকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে হয়েছে। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘খাদ’ ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র প্রথমে তাঁর কাছেই এসেছিল। কিন্তু সে সময় তিনি একটি ধারাবাহিকের সঙ্গে মাসিক চুক্তিতে আবদ্ধ থাকায় টানা ১৬-১৭ দিন শুটিংয়ের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাননি। একইভাবে নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের একটি ছবির প্রস্তাবও তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল ধারাবাহিকের কাজের জন্য। তাঁর কথায়, অনেক পরিচালক তাঁকে কখনও কাজের সুযোগই দেননি।
তবে তার মধ্যেও ঋতুপর্ণ ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মতো পরিচালকদের সঙ্গে একাধিক উল্লেখযোগ্য কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। অভিনয় জীবনে প্রাপ্তির তালিকাও তাই কম নয়। একাধিক টেলিসম্মান, আনন্দলোক পুরস্কার এবং দর্শকের ভালোবাসাই তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ বলে মনে করেন অভিনেতা। পরিবারের প্রসঙ্গ উঠতেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শঙ্কর চক্রবর্তী। তিনি জানান, বর্তমানে তাঁর পরিবার বলতে মূলত তাঁর মেয়েই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর মেয়ে মুম্বইয়ের বিনোদন জগতে অত্যন্ত ভালো জায়গায় কাজ করছেন। রেমো ডি’সুজা, আকাশ খুরানার মতো পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ “স্বর্ণযুগেই শুধু তারকা ছিল আর এখন নেই, এটা আমি মানি না” উত্তম-সৌমিত্রদের যুগই কি শেষ কথা, তাঁদের নিয়েই কেন এত মাতামাতি? বর্তমানেও আছেন অসাধারণ অভিনেতা, স্পষ্ট মত ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়ের! এই প্রজন্মকে খাটো করতেই অতীতকে বড় করে দেখানো হয়, কিংবদন্তিদের ঘিরে প্রচলিত ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়লেন আবির চট্টোপাধ্যায়ের বাবা?
অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বর্তমানে একটি বড় প্রযোজনা সংস্থায় কনটেন্ট ও ডেভেলপমেন্ট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। মেয়েকে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে শংকর বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়ে অত্যন্ত মেধাবী এবং পরিশ্রমী। জীবনের নানা কঠিন সময়ে মেয়ের সাফল্য তাঁকে নতুন করে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। একইসঙ্গে তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী আর আজ তাঁর পাশে নেই। সেই শূন্যতা কোনও দিনই পূরণ হওয়ার নয়। তবে মেয়ের সাফল্য এবং দর্শকের ভালোবাসাই তাঁকে এখনও নতুন উদ্যমে কাজ করে যাওয়ার শক্তি দেয়। অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আজও এতটাই অটুট যে নতুন নাটকের মহড়া থেকে শুরু করে একের পর এক সিনেমা এবং ওয়েব সিরিজের কাজ নিয়ে এখনও সমান ব্যস্ত এই বর্ষীয়ান অভিনেতা।






