মহানায়ক উত্তম কুমার এবং অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরেই নানা আলোচনা ও বিতর্ক চলে আসছে। সমাজের একাংশ তাঁদের সম্পর্ককে কখনও মেনে নিতে পারেনি, আবার অনেকেই সুপ্রিয়া দেবীকে নানা কটাক্ষের মুখেও ফেলেছিলেন। তবুও জীবনের শেষ প্রায় দুই দশক তাঁরা একসঙ্গেই কাটিয়েছিলেন। জানা যায়, উত্তম কুমার সুপ্রিয়া দেবীকে বিয়ে করেছিলেন। তবে সেই বিয়ে আইনি স্বীকৃতি পায়নি, কারণ তিনি তাঁর প্রথম স্ত্রী গৌরী দেবীকে কখনও ডিভোর্স দেননি। এই পরিস্থিতির মধ্যেও সুপ্রিয়া দেবী প্রকাশ্যে সবসময় উত্তম কুমারকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করতেন এবং সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রায়ই তাঁকে ‘আপনাদের দাদা’ বলেই সম্বোধন করতেন। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষায় তিনি কখনও পিছিয়ে যাননি।
সম্প্রতি উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে এক সাক্ষাৎকারে তাঁর নাতনি নবমিতা চট্টোপাধ্যায় পরিবারের অতীত নিয়ে কিছু মন্তব্য করেন। তিনি উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর সম্পর্কের পাশাপাশি মহানায়কের মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি বিতর্কের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য সামনে আসতেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। জানা যায়, উত্তম কুমারের মৃত্যুর পরে সম্পত্তিতে অধিকার দাবি করে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছিল এবং সেই মামলা দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে চলেছিল। তবে সেই মামলা করেছিলেন সোমা চট্টোপাধ্যায়, যিনি নিজেকে উত্তম কুমারের কন্যা বলে দাবি করেছিলেন। যদিও আদালতে সেই দাবি প্রমাণিত হয়নি। এই ঘটনাকে ঘিরেই ফের পুরনো বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।
অতীতে এক সাক্ষাৎকারে টিভি নাইন বাংলাকে দেওয়া বক্তব্যে সোমা চট্টোপাধ্যায় নিজের শৈশব এবং মায়ের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘একদিন জানতে পারি উত্তমকুমারের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক আছে। খুব ছোট ছিলাম তো, সেরকম কোনও প্রতিক্রিয়া ছিল না আমার। তার উপর আমি বোর্ডিং স্কুলে পড়তাম। তবে এটুকু বলব, আমি মায়ের খুব বাধ্য মেয়ে ছিলাম। তিনি আমাকে যা বলতেন, আমি শুনতাম। মায়ের জীবনের একটা অধ্যায় ছিল সেটা। মা যাতে ভাল থাকে, সেটাই আমার প্রধান দেখার বিষয় ছিল। ফলে মায়ের উপরই সবটা ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি। ওঁদের সম্পর্ক নিয়ে কোনও দিন নিজের মতামত প্রকাশ করিনি।’ তাঁর এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, ছোটবেলায় বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কোনও বিরোধিতা করেননি।
সোমা চট্টোপাধ্যায়ের ছোটবেলাতেই তাঁর বাবা বিশ্বনাথ চৌধুরী এবং মা সুপ্রিয়া দেবীর বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর ১৯৬৩ সাল থেকে ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবী একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন। সেই সময় সমাজের অনেকেই এই সম্পর্ককে লিভ ইন বা পরকীয়া হিসেবেই দেখতেন। এমন পরিস্থিতিতে একজন ছোট মেয়ের কাছে নিজের জন্মদাতা বাবার পরিবর্তে অন্য একজন মানুষকে মায়ের পাশে দেখতে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। শুরুতে তাঁর মনেও নানা দ্বিধা এবং মানসিক টানাপোড়েন ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই দূরত্ব কমতে থাকে। উত্তম কুমারের ব্যবহার এবং স্নেহই সেই সম্পর্ককে ধীরে ধীরে সহজ করে তোলে বলে বিভিন্ন সময়ে জানা গেছে।
সোমা চট্টোপাধ্যায়কে উত্তম কুমার নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করতেন বলে বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি সোমার বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রেও তাঁকে নিজের মেয়ে হিসেবেই পরিচয় দিয়েছিলেন মহানায়ক। তবে বাস্তব জীবনে উত্তম কুমারের অবস্থান নিয়ে সোমার অনুভূতি ছিল কিছুটা ভিন্ন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে। প্রত্যেক মেয়ের মতো আমিও বাবাকে ভালবেসেছিলাম। বাবা চলে গেলেন অন্যত্র। তাই পাঁচ বছর বয়স থেকে আমার জীবন মা-কেন্দ্রিক হয়ে গেল। অনেক ছোটবেলা থেকে উত্তমকুমারকে আমাদের বাড়িতে এসে থাকতে দেখেছি। মা যা করেছেন, আমি তাই-ই মেনে নিয়েছি। তাই আপনার এই প্রশ্নের উত্তর আমি ঠিক মতো দিতে পারব না।’ তাঁর বক্তব্যে শৈশবের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুনঃ ‘হিজ*রে কোথাকার!’ মঞ্চে উঠে রাধা-কৃষ্ণের গান গাইতেই চরম কটাক্ষে’র মুখে পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়! শ্রীকৃষ্ণের কীর্তন শুনিয়ে কোন ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন গায়িকা? কীভাবেই বা নিজের ও ঈশ্বরের অপমানের জবাব দিলেন তিনি?
উত্তম কুমারকে বাবা হিসেবে কতটা গ্রহণ করতে পেরেছিলেন, সেই প্রশ্নের জবাবেও সোমা নিজের অনুভূতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘উত্তমকুমার একজন ফিল্মস্টার ছিলেন। মায়ের সঙ্গে তিনি থাকতেন ঠিকই, কিন্তু নিজের পরিবারকে ত্যাগ করতে পারেননি। আমার মনে হত, তিনি যথেষ্ট শক্ত মানুষ নন। আমার মাকেই অনেক বেশি শক্ত (স্ট্রং) মানুষ বলে মনে হয়েছে চিরকাল।’ তাঁর এই মন্তব্য এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। একই সঙ্গে উত্তম কুমার, সুপ্রিয়া দেবী এবং তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে বহু পুরনো বিতর্কও আবার সামনে উঠে এসেছে। যদিও এই বিষয়গুলি বহু বছরের পুরনো, তবুও মহানায়কের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ আজও কমেনি।






