“জানিস তোর বাবা যেতেই চাইছিল না, পর্দাটা টেনে ধরেছিল… মায়ের মুখে কথাটা শুনে বুকটা কেঁপে উঠেছি” “বাবা মা*রা গেলেন পরদিনই… শুটিং চলাকালীন হারালাম প্রথম সন্তানকেও, কারোর যেন এমন না হয়!” বুকভরা ক’ষ্ট নিয়ে ক্যামেরার সামনে হাসতে হয়েছে বহুবার! পর্দায় যাঁকে দেখে বছরের পর বছর হেসেছে দর্শক, তাঁর জীবনেই লুকিয়ে আছে একাধিক য’ন্ত্রণার অধ্যায়, জানাতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন বিশ্বনাথ বসু!

বিনোদন জগতের পর্দার সামনে তারকাদের হাসি, সাফল্য আর জনপ্রিয়তাই চোখে পড়ে। কিন্তু ক্যামেরার আড়ালে তাঁদের জীবনেও যে কতটা ওঠানামা, লড়াই আর না বলা কষ্ট লুকিয়ে থাকে, তা সবসময় বোঝা যায় না। বছরের পর বছর দর্শকদের হাসিয়ে যাওয়া অভিনেতা বিশ্বনাথ বসুর জীবনেও রয়েছে তেমনই একাধিক কঠিন অধ্যায়। অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার জন্য স্টুডিওর দরজায় দরজায় ঘোরা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোক সবকিছুর মধ্যেও কীভাবে নিজেকে সামলে এগিয়ে গিয়েছেন, সেই অজানা গল্পই উঠে এসেছে তাঁর এক সাক্ষাৎকারে। বাংলা বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ তিনি, কমেডি চরিত্রে তাঁর স্বতন্ত্র অভিনয় বহু বছর ধরে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছে। তবে এই জায়গায় পৌঁছনোর পথ মোটেই সহজ ছিল না।

ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচিত কেউ না থাকলেও ছোট থেকেই অভিনয়ের প্রতি প্রবল টান ছিল তাঁর। পাড়ার নাটক, স্কুলের থিয়েটার, পথনাটিকা সবকিছুর মধ্য দিয়েই নিজের অভিনেতা সত্তাকে তৈরি করেছেন। একটা সময় শুধু একটি সুযোগের আশায় স্টুডিওর পর স্টুডিও ঘুরেছেন। হতাশাও এসেছে, এমনকী একসময় চরম ফ্রাস্ট্রেশনে ভুগেছেন। কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে আজ তাঁর ঝুলিতে রয়েছে দুই শতাধিক সিনেমা এবং অসংখ্য ধারাবাহিকের কাজ। তবে পেশাগত লড়াইয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে গভীর আঘাত। সাক্ষাৎকারে বিশ্বনাথ বসু জানান, ২০০৭ সালে বাবার মৃ’ত্যুর আগে একটি রাতের শুটিংয়ে যাওয়ার সময় থেকেই তাঁর অদ্ভুত এক রকম মন খারাপ লাগছিল যা কখনও হয় না। শুটিং চলাকালীন তাঁর মা ফোন করে বাবার অবস্থার কথা জানান। যা শুনে পায়ের তলার মাটি সরে যায় তাঁর!

অভিনেতাকে তাঁর মা বলেন, “জানিস তো তোর বাবা যেতেই চাইছিল না, পর্দাটা টেনে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল!” অভিনেতার কথায়, “মায়ের মুখে এই কথাটা শোনা মাত্রই আমার বুকটা কেঁপে উঠেছিল, শো করতে গিয়ে বলেছিলাম আমাকে একটু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেবেন? বাবার না খুব শরীর খারাপ…কিন্তু পরদিনই বাবা চলে গেল ” পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবাকে আর বাঁচানো যায়নি। পরদিনই তাঁর বাবা মারা যান। এত বড় ধাক্কার পরেও খুব বেশি সময় কাজ থেকে দূরে থাকার সুযোগ ছিল না। সহকর্মীদের সহযোগিতায় নিজেকে সামলে আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

কারণ দর্শকের সামনে দাঁড়ালে ব্যক্তিগত কষ্টকে আড়াল করেই চরিত্রের মানুষটিকে ফুটিয়ে তুলতে হয় সেই কঠিন বাস্তবের কথাও উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে। কিন্তু বিশ্বনাথের জীবনে এর থেকেও বড় শোক এসেছিল ২০০৯ সালে। সেই সময় একটি শুটিংয়ের কাজে মালয়েশিয়ায় ছিলেন তিনি। দেশে তাঁর স্ত্রী দেবিকা বসু সন্তানসম্ভবা ছিলেন। সেখানেই জানতে পারেন, তাঁদের প্রথম সন্তানকে হারিয়েছেন তাঁরা। পরিস্থিতি এমন ছিল যে শুটিং মাঝপথে ফেলে তৎক্ষণাৎ দেশে ফিরে আসাও সম্ভব হয়নি। ফলে বুকের মধ্যে অসহনীয় কষ্ট নিয়েই তাঁকে শুটিং চালিয়ে যেতে হয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তখন ভয়াবহ শোক, অথচ ক্যামেরার সামনে তাঁকেই স্বাভাবিক থেকে অভিনয় করে যেতে হয়েছে। দেশে ফিরে স্ত্রীর পাশে দাঁড়ান তিনি। সেই হারানোর শূন্যতা যে কোনওদিন পূরণ হওয়ার নয় তাঁর কথাতেই স্পষ্ট সেই বেদনা।

আরও পড়ুনঃ “সৃজলা কি সত্যি জাস্টিস পেল?” “এতো বড় অপরাধ করার পরও কোনও শাস্তিই হলো না নন্দিনীর, টিআরপির জন্য কি সব মাফ?” “লাস্ট ওয়ার্নিং নয়, ঘর থেকে বের করুন!” সৃজলার ডিম্বাশয় ও হাঁটুর বন্ধনী ক্ষ’তিগ্রস্ত, দর্শকরা বলছেন ‘ন্যায় বিচার চাই!’ ৬০-৭০ শতাংশ দর্শক তুলছেন নন্দিনীর এভিকশনের দাবি! ফের কাঠগড়ায় বিগ বস বাংলা?

বিশ্বনাথ বসুর গল্প তাই শুধুমাত্র একজন সফল অভিনেতার হয়ে ওঠার গল্প নয়, বরং হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক মানুষের লড়াইয়ের গল্প। একটা সময় যেখানে একটি সুযোগের জন্য তাঁকে স্টুডিওর দরজায় ঘুরতে হয়েছে, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। জীবনের কঠিনতম মুহূর্তেও পেশাগত দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাননি। দর্শকদের হাসাতে গিয়ে নিজের চোখের জল লুকিয়ে রাখা সেই অভিনেতার জীবনের এই অধ্যায় হয়তো তাঁর পর্দার জনপ্রিয় চরিত্রগুলির মতো এতটা আলোচিত নয়, কিন্তু তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নেপথ্যে থাকা মানুষটিকে বুঝতে গেলে এই গল্পগুলিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

You cannot copy content of this page