সমাজে মদ্যপানকে আজ অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিকতা, উদযাপন কিংবা সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জুড়ে দেখা হয়। জন্মদিনের পার্টি থেকে শুরু করে গেট-টুগেদার কিংবা পিকনিক অনেকের কাছেই আনন্দের সংজ্ঞা যেন মদ্যপান ছাড়া অসম্পূর্ণ। কিন্তু এই সংস্কৃতির প্রভাব যে শিশু ও কিশোরদের উপর কতটা ভয়াবহভাবে পড়ছে, তা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সমাজের একাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারে বড়দের আচরণ থেকেই শিশুরা অনেক কিছু শেখে। ফলে বাড়ির পরিবেশে মদ্যপানকে স্বাভাবিক করে তোলা হলে তার প্রভাব অল্প বয়সেই পড়তে পারে শিশুদের মানসিকতা ও অভ্যাসের উপর।
অভিনেতা ববি চক্রবর্তী শুধুমাত্র বাংলা বিনোদন জগতের একজন পরিচিত মুখ নন, সমাজের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য রাখার জন্যও তিনি সমানভাবে পরিচিত। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা, শিশুদের মানসিক বিকাশ, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং বর্তমান প্রজন্মের জীবনযাপন নিয়ে তিনি প্রায়ই নিজের মতামত তুলে ধরেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মদ্যপানের প্রবণতা বৃদ্ধি এবং বাড়িতে বার সংস্কৃতি নিয়ে তিনি নিজের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, আজকের সমাজে আনন্দ করার সংজ্ঞাই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে আগামী প্রজন্মের উপর।
সাক্ষাৎকারে ববি চক্রবর্তী বলেন, পার্টি মানেই একগাদা রাসায়নিক পদার্থ শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া নয়। মদ, সিগারেট, গাঁজা, হুক্কা কিংবা ভেপিং এগুলো কোনওটাই আনন্দের সমার্থক হতে পারে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আমরা শিশুদের কী বার্তা দিচ্ছি? তারা আজ এমন একটি সমাজে বড় হচ্ছে, যেখানে পার্টি বা আনন্দ মানেই মদ্যপান বলে তাদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। তাঁর মতে, এই ভুল বার্তাই ভবিষ্যতে শিশুদের বিপথে চালিত করছে। তিনি যাদবপুরের একটি বহু পুরনো ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে জন্মদিনের পার্টিতে মদ্যপানকে কেন্দ্র করে মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সি এক কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। ববি চক্রবর্তীর কথায়, এই ধরনের ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং সমাজ থেকে শিশুদের কাছে পৌঁছে যাওয়া ভুল বার্তারই ফল।
তিনি আরও বলেন, বন্ধুত্ব কিংবা কোনও সামাজিক সম্পর্কের প্রমাণ দেওয়ার জন্য একসঙ্গে বসে মদ্যপান করার কোনও প্রয়োজন নেই। গেট-টুগেদার, পিকনিক বা পারিবারিক অনুষ্ঠান আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করা যায় সম্পূর্ণ অন্যভাবেও। কিন্তু বর্তমান সমাজে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, মদ্যপান ছাড়া আনন্দ অসম্পূর্ণ। এই সংস্কৃতি যে আগামী প্রজন্মকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, আজ থেকে এক দশকেরও বেশি সময় আগে যদি এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
আরও পড়ুনঃ মাত্র ৫২ বছর বয়সেই মৃ’ত্যু প্রথম পক্ষের বড় মেয়ে বৈশালীর! সন্তান হারানোর শোকে শেষ বয়সে ভেঙে পড়লেন দীপঙ্কর দে! ধরে রাখতে পারলেন না চোখের জল, কাঁপা গলায় কী বললেন বর্ষীয়ান অভিনেতা? কী হয়েছিল মেয়ের, কীভাবে মৃ’ত্যু? দোলনের সঙ্গে সহবাসের জন্য ছেড়েছিলেন প্রথম সংসার, জীবনের কোন না-বলা বেদনাই আজও তাড়া করে বেড়ায় তাঁকে?
সাক্ষাৎকারে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও শেয়ার করেন অভিনেতা। তিনি জানান, একবার একটি পরিবারের ছোট্ট সন্তান দীর্ঘদিন ধরে মদ্যপানের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে বলে জানতে পেরে তিনি ওই শিশুর বাবাকে ফোন করেছিলেন। প্রথমে বিষয়টি শুনে শিশুটির বাবা ফোন কেটে দিলেও কিছুদিন পর নিজেই ববি চক্রবর্তীকে ফোন করে জানান যে, তিনি বাড়ি থেকে সম্পূর্ণ বার সরিয়ে দিয়েছেন। সেই খবর শুনে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। ববি চক্রবর্তীর মতে, অনেক সময় সামাজিক প্রতিপত্তি, অর্থ কিংবা আধুনিকতার পরিচয় দেওয়ার জন্য মানুষ বাড়িতে বার তৈরি করেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যে বাড়ির শিশুদের উপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তা অনেক অভিভাবকই বুঝতে পারেন না। তাঁর বক্তব্য, শিশুরা কখন এবং কীভাবে এই ধরনের বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে, তা বাবা-মায়ের অজান্তেই ঘটে যেতে পারে। তাই আগামী প্রজন্মকে সুস্থ ও সচেতনভাবে বড় করে তুলতে পরিবারের পরিবেশ এবং অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।






